মরুভূমির বুকে ত্যাগের মহিমা: মধ্যপ্রাচ্যে উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
আকাশে জিলহজ মাসের বাঁকা চাঁদ দেখার পর থেকেই যে আবহের অপেক্ষা ছিল, আজ তার পূর্ণতা পেল। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে আজ বুধবার (২৭ মে) অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। মহামতি হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক মহান আত্মত্যাগের স্মৃতি স্মরণ করে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর একাংশ আজ মেতে উঠেছে উৎসবের আমেজে। আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম আনুগত্য ও রাহে সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে মরুভূমির এ জনপদে সকাল থেকেই বইছে ঈদের আনন্দধারা।
ভোরের আলো ফোটার আগেই উৎসবের মূল আমেজ শুরু হয় আমিরাতের প্রতিটি প্রান্তে। সুগন্ধি আতর মেখে, নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে দলে দলে মানুষ ছুটে যান স্থানীয় ঈদগাহ ও মসজিদগুলোর দিকে। মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরমকে উপেক্ষা করে মুসল্লিদের কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন আমিরাতে প্রায় একই সময়ে কিন্তু সুনির্দিষ্ট সূচি মেনে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সূর্যোদয়ের পরপরই আজমানের মুসল্লিরা ভোর ৫টা ৩৯ মিনিটে প্রথম জামাতে শরিক হন। এর পরপরই রাস আল খাইমায় ৫টা ৪০ মিনিটে, ফুজাইরাহতে ৫টা ৪১ মিনিটে এবং শারজাহ ও উম্মে আল কুইনে ৫টা ৪৩ মিনিটে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির প্রধান দুই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র দুবাই এবং আল-আইনে ঠিক ৫টা ৪৫ মিনিটে ঈদের খুতবা ও নামাজ শুরু হয়। আর রাজধানী আবুধাবিতে মুসল্লিরা সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয় এবং চিরচেনা সৌহার্দ্যের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হন বিভিন্ন দেশের মানুষ।
এই উৎসবের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের বিশাল এক প্রবাসী জনগোষ্ঠী এই ঈদকে কেন্দ্র করে এক টুকরো নিজ দেশকে যেন মরুভূমির বুকে নামিয়ে এনেছেন। গত কয়েকদিন ধরে স্থানীয় পশুর হাটগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। প্রবাসীরা তাদের সাধ্য ও সামর্থ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কেউ দলগতভাবে উট বা গরু, আবার কেউ এককভাবে দুম্বা ও ছাগল ক্রয় করেছেন। ঈদের নামাজ শেষ হতেই শুরু হয়ে যায় পশু কোরবানির ব্যস্ততা। আমিরাত সরকারের কড়া পরিচ্ছন্নতা বিধিমালা ও আধুনিক স্লটারহাউস (পশু জবাইখানা) ব্যবস্থার কারণে প্রবাসীরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তাদের কোরবানি সম্পন্ন করছেন।
যান্ত্রিক প্রবাস জীবনে ঈদুল আজহা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, বরং এটি দূর পরবাসে থাকা বিভিন্ন সংস্কৃতির ও দেশের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ঈদের নামাজ ও কোরবানি শেষে প্রবাসী বাংলাদেশিরা একে অপরের ঘরে যাচ্ছেন, রান্না হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সব খাবার। প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কলে দেশে থাকা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ মরুভূমির খোলা প্রান্তরে বা পার্কগুলোতে মেতে উঠেছেন আড্ডায়। একদিকে যেমন রয়েছে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার কিছুটা মন খারাপ, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে সহকর্মীদের সাথে উৎসব ভাগ করে নেওয়ার অনাবিল আনন্দ। ত্যাগের এই উৎসব প্রবাসীদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও সুদৃঢ় করে তুলেছে, যা আধুনিক বাস্তবতায় এক অনন্য সম্প্রীতির গল্প তৈরি করে।