৬ দশকের জয়ধ্বনি থামছে: অবসরে যাচ্ছেন পাকিস্তান ক্রিকেটের আইকন ‘চাচা ক্রিকেট’

 প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ০৮:২৩ অপরাহ্ন   |   খেলাধুলা

৬ দশকের জয়ধ্বনি থামছে: অবসরে যাচ্ছেন পাকিস্তান ক্রিকেটের আইকন ‘চাচা ক্রিকেট’

​ক্রীড়া প্রতিবেদক: মাঠের উত্তাপ আর গ্যালারির উন্মাদনা—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে যিনি গত প্রায় ৬০ বছর ধরে পাকিস্তান ক্রিকেটের সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন, সেই চেনা মুখটি আর দেখা যাবে না। সবুজ জার্সি, হাতে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা আর মুখে অবিরাম স্লোগান নিয়ে মাঠ কাঁপানো জনপ্রিয় ও একনিষ্ঠ ভক্ত আবদুল জলিল অবশেষে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ক্রিকেট দুনিয়া তাকে একনামে চেনে ‘চাচা ক্রিকেট’ হিসেবে। ৭৬ বছর বয়সী এই জীবন্ত কিংবদন্তি আর মাত্র দুটি সিরিজে গ্যালারিতে থেকে নিজের প্রিয় দলকে সমর্থন জানাবেন, যার পর চিরতরে তুলে রাখবেন তার প্রিয় সেই পতাকা।

​চাচা ক্রিকেটের এই দীর্ঘ পথচলার শুরুটা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫৬ বছর আগে। ১৯৬৮-৬৯ সালের কথা, যখন লাহোরে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তান। মাত্র ১৯ বছর বয়সের সেই তরুণ আবদুল জলিল প্রথমবারের মতো গ্যালারিতে বসে পাকিস্তানের ম্যাচ উপভোগ করেছিলেন। সেই যে ক্রিকেটের প্রেমে পড়লেন, আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সময়ের সাথে সাথে তিনি শুধু একজন সাধারণ দর্শকই থাকেননি, বরং হয়ে উঠেছেন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ছায়াসঙ্গী। দেশের মাটিতে তো বটেই, বিশ্বজুড়ে যেখানেই পাকিস্তান দল গেছে, গ্যালারিতে তার উপস্থিতি ক্রিকেটারদের জুগিয়েছে বাড়তি অনুপ্রেরণা।

​শনিবার রাওয়ালপিন্ডিতে শুরু হতে যাওয়া পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজটি হতে যাচ্ছে দেশের মাটিতে তার শেষ অ্যাসাইনমেন্ট। ঘরের মাঠে শেষবারের মতো স্টেডিয়ামে গিয়ে গলা ফাটাবেন তিনি। এরপর বছরের শেষ দিকে পাকিস্তান দল যখন টেস্ট সিরিজ খেলতে ইংল্যান্ড সফরে যাবে, তখন দূর পরবাসে শেষবারের মতো দলের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বর্ণাঢ্য গ্যালারি জীবনের ইতি টানবেন এই প্রবীণ ক্রিকেটপ্রেমী।

​দীর্ঘ এই যাযাবর জীবনে ক্রিকেটের আঙিনা থেকে অসংখ্য স্মৃতি আর স্মারক কুড়িয়েছেন চাচা ক্রিকেট। অবসরে গেলেও ক্রিকেটকে তিনি নিজের জীবন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন না। এত বছর ধরে সংগ্রহ করা জার্সি, অটোগ্রাফযুক্ত ব্যাট, বল আর দুর্লভ সব ছবি নিয়ে একটি জাদুঘর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ের টানে সংগ্রহ করা সব স্মারক আমি সেই জাদুঘরে প্রদর্শন করব, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের এই সোনালী দিনগুলোর সাক্ষী হতে পারে। একই সাথে তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে জানান, পাকিস্তানের হয়ে ৫০০টি ম্যাচে মাঠে থেকে সমর্থন দেওয়ার যে ব্যক্তিগত লক্ষ্য তিনি নির্ধারণ করেছিলেন, তা ইতিমধ্যেই সফলভাবে পূরণ করেছেন।

​প্রায় ছয় দশক ধরে এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে চষে বেড়ানোর পেছনে কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল না আবদুল জলিলের। এর পেছনে কাজ করেছে কেবলই ক্রিকেট ও মাতৃভূমির প্রতি এক বুক খাঁটি ভালোবাসা। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি যা কিছু করেছেন, তা দেশের একজন ভালো দূত হিসেবে বিশ্বের বুকে পাকিস্তানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য। মাঠের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সমর্থকদের মুখেও তিনি আনন্দ ফটাতে চেয়েছেন সবসময়। ক্রিকেটের রঙিন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো কিছু সমাজসেবামূলক কাজে উৎসর্গ করতে চান এই সাদা দাড়িওয়ালা মানুষটি।

​পাকিস্তান ক্রিকেটের প্রসঙ্গ আসলেই ভারতের সাথে তাদের চিরন্তন দ্বৈরথ এবং মাঠের স্নায়ুযুদ্ধের কথা চলে আসে। আর ভারত-পাক লড়াইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলোর অন্যতম ১৯৮৬ সালের শারজাহ কাপের ফাইনাল। চেতন শর্মার শেষ বলে জাভেদ মিয়াঁদাদের সেই ঐতিহাসিক ছক্কা আজ এত বছর পরও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে। সেই মহাকাব্যিক ম্যাচেরও জীবন্ত সাক্ষী ছিলেন চাচা ক্রিকেট। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, মিয়াঁদাদ যখন চেতন শর্মাকে শেষ বলে ছক্কাটি মারল, আমি ঠিক গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলাম। আজও চোখ বন্ধ করলে স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি, বলটি কীভাবে বাতাসে ভেসে ডিপ মিডউইকেটের ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে চলে গিয়েছিল।

​চাচা ক্রিকেটের বিদায় কেবল একজন ভক্তের প্রস্থান নয়, বরং পাকিস্তান ক্রিকেটের একটি যুগের অবসান। গ্যালারিতে তার সেই চিরচেনা গর্জন আর দেখা যাবে না ঠিকই, তবে ক্রিকেটের ইতিহাসে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অনন্য প্রতীক হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন আবদুল জলিল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement