ফাঁকা ঢাকার আকাশে স্বস্তির বাতাস: উৎসবের আবহে চিরচেনা যানজটের শহরে প্রকৃতির উপহার

 প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১২:৩৩ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

ফাঁকা ঢাকার আকাশে স্বস্তির বাতাস: উৎসবের আবহে চিরচেনা যানজটের শহরে প্রকৃতির উপহার

অনলাইন ডেস্ক:

ঈদের চিরচেনা আনন্দ আর উৎসবের আমেজে রাজধানী ঢাকা এখন একেবারেই শান্ত, কোলাহলমুক্ত। নাড়ির টানে লাখ লাখ মানুষের ঢাকা ছাড়ার পর ব্যস্ত এই মেগাসিটি যেন এক অলস দুপুরের শান্ত রূপ ধারণ করেছে। রাস্তাঘাটে নেই গাড়ির হর্ন, নেই কালো ধোঁয়া আর চিরচেনা যানজটের সেই চেনা ভোগান্তি। ফাঁকা ঢাকার এই রূপ যেমন চোখকে শান্তি দিচ্ছে, তেমনি ঢাকাবাসীর ফুসফুসেও এনে দিয়েছে এক দারুণ স্বস্তির খবর। ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সকালে ঢাকা যেন ফিরে পেয়েছে তার হারিয়ে যাওয়া বিশুদ্ধ রূপ, যার প্রতিফলন ঘটেছে বৈশ্বিক বায়ুমান সূচকেও।

ছুটির এই সকালে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (আইকিউএয়ার) তথ্যানুযায়ী, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বাতাসের মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। শুক্রবার খুব সকালে যখন নগরী ঘুম থেকে জাগছিল, তখন বায়ুর মান কিছুটা ‘সংবেদনশীলদের জন্য অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায় ছিল। সকাল ৭টার দিকে ১২৬টি শহরের মধ্যে ঢাকা দূষণের দিক থেকে সপ্তম অবস্থানে উঠে এসেছিল, যার স্কোর ছিল ১১০। এর দুই ঘণ্টা পর সকাল ৯টাতেও স্কোর খুব একটা কমেনি, ১০৭ পয়েন্ট নিয়ে বাতাস তখনো সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে সকাল ১০টার দিকে ঢাকার বাতাসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। রাস্তাঘাটে যানবাহন ও মানুষের চলাচল সীমিত থাকায় বাতাসের মান দ্রুত উন্নত হতে শুরু করে। সকাল ১০টায় ঢাকার দূষণ স্কোর নেমে আসে ৯৫-এ, যার ফলে বৈশ্বিক তালিকায় ঢাকার অবস্থান এক লাফে নেমে যায় ১৩ নম্বরে।

আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমানের এই স্কোর ঢাকাবাসীর জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। সাধারণত কোনো শহরের বায়ুমান সূচক শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে তাকে 'ভালো' এবং ৫১ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকলে 'মাঝারি' বা 'সহনীয়' বলে গণ্য করা হয়। সেই হিসেবে ছুটির দিনের এই সকালে ঢাকার বাতাস সহনীয় মাত্রায় নেমে এসেছে, যা বছরের অন্য দিনগুলোতে ভাবাই যায় না। অন্যদিকে, সূচক যখন ১০১ থেকে ১৫০ হয় তখন তা সংবেদনশীলদের জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১ থেকে ২০০ হলে সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ হলে 'খুবই অস্বাস্থ্যকর' এবং ৩০১-এর ওপরে গেলে তা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বা বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়। শীতকাল বা বছরের সাধারণ কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে ঢাকাকে প্রায়শই ২০০ বা ৩০০-এর কাছাকাছি স্কোর নিয়ে শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় থাকতে দেখা যায়। সেই তুলনায় ৯৫ স্কোর ঢাকার জন্য এক বিরাট স্বস্তির বার্তা।

ঢাকায় যখন বাতাসের এই ইতিবাচক পরিবর্তন, তখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যান্য মেগাসিটিগুলো দূষণের তীব্রতায় ভুগছিল। শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে আইকিউএয়ারের তালিকায় শীর্ষ দূষিত শহর হিসেবে নাম লেখায় কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা, যার স্কোর ছিল ১৭৩। এর ঠিক পেছনেই ১২৭ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ভিয়েতনামের হ্যানয়। এছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে যথাক্রমে ছিল ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা (স্কোর ১২৪) এবং চিলির সান্তিয়াগো (স্কোর ১১৯)। এই বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের তুলনায় ঢাকার বর্তমান অবস্থান প্রমাণ করে যে, মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে অতিরিক্ত যানবাহন এবং নির্মাণকাজের স্থবিরতা কীভাবে একটি শহরের পরিবেশকে রাতারাতি বদলে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদের এই সময়টাতে ঢাকার বাতাস উন্নত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো কলকারখানা বন্ধ থাকা, রাস্তাঘাটে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়া এবং বাতাসে ধূলিকণার ওড়াউড়ি বন্ধ হওয়া। তবে পরিবেশবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই স্বস্তি সাময়িক। ঈদের ছুটি শেষ হতেই চিরচেনা রূপে ফিরবে ঢাকা, আবারও শুরু হবে উন্নয়নযজ্ঞ আর যানবাহনের কালো ধোঁয়া। তাই ফাঁকা ঢাকার এই সাময়িক নির্মল বাতাস উপভোগ করার পাশাপাশি, দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে ঢাকার বায়ুমানকে এই সহনীয় পর্যায়ে ধরে রাখা যায়, তা নিয়ে এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট ও টেকসই নগর পরিকল্পনার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement