মায়ের হাতের মাংস আর খাওয়া হলো না ইব্রাহিমের: ঈদের আনন্দ নিমেষেই রূপ নিল বিষাদে

 প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

মায়ের হাতের মাংস আর খাওয়া হলো না ইব্রাহিমের: ঈদের আনন্দ নিমেষেই রূপ নিল বিষাদে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার:

ঈদের আনন্দ আর উৎসবের আমেজ যখন প্রতিটি ঘরে ঘরে দোলা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই একটি আকস্মিক ও নির্মম ট্র্যাজেডি স্তব্ধ করে দিল পুরো কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকাকে। ঈদের দিন সন্ধ্যায় চুলার ওপর টগবগ করে ফুটছিল গরুর মাংসের ঝোল। ক্ষুধার্ত ছেলে বারবার মায়ের আঁচল ধরে বলছিল, ‘মা, খিদে লেগেছে, তাড়াতাড়ি রুটি আর মাংস দাও।’ কিন্তু নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাসে মায়ের হাতের সেই পরম তৃপ্তির রান্না আর মুখে তোলা হলো না পনেরো বছর বয়সী কিশোর মো. ইব্রাহিমের। বাড়ির ঠিক পাশেই শুরু হওয়া এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের আওয়াজ শুনে কৌতূহলবশত বাইরে বের হতেই মুহূর্তের মধ্যে চিরতরে হারিয়ে গেল একটি তাজা প্রাণ। ছেলেকে হারিয়ে মা নুর নাহার বেগমের বুকফাটা আর্তনাদে এখন ভারী হয়ে উঠেছে টেকনাফের বাতাস, যেখানে এক লহমায় উৎসবের সব আলো ঢাকা পড়েছে এক গভীর ও অন্ধকার অমাবস্যায়।

হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক আটটার দিকে কক্সবাজার জেলার সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী এলাকায়। নিহত ইব্রাহিম ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা শামশুল আলমের ছেলে। জানা গেছে, বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের পর থেকে চরম অভাব-অনটনের মাঝেও মায়ের সঙ্গে অত্যন্ত স্নেহে বড় হচ্ছিল ইব্রাহিম। ঈদের দিনটি তাদের জন্য নিয়ে এসেছিল সামান্য একটু খুশির উপলক্ষ। অন্য সবার মতো ঈদে নতুন পোশাক বা বড় কোনো আয়োজন না থাকলেও, মা ও ছেলে মিলে দুপুরে এলাকার এক বিত্তবান গৃহস্থের বাড়িতে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের কাজে সহযোগিতা করতে গিয়েছিলেন। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে পারিশ্রমিক ও উপহার হিসেবে তাঁরা পান তিন কেজি গরুর মাংস। আনন্দিত মনে সন্ধ্যায় সেই মাংস নিয়ে ঘরে ফেরেন মা নুর নাহার বেগম। অভাবের সংসারে দীর্ঘদিন পর মাংসের স্বাদ নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল কিশোর ইব্রাহিম। তাই গোসল শেষ করেই সে মাকে রান্না দ্রুত শেষ করার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছিল।

কিন্তু মানুষের জীবনের সব হিসাব কি আর সবসময় মেলে? মাংস তখনো পুরোপুরি সেদ্ধ হয়নি, ক্ষণিকটা কাঁচা রয়ে গেছে। ক্ষুধার তীব্রতায় ইব্রাহিম একটি টুকরো মুখে তুলে নিলেও তা ঠিকমতো চিবিয়ে গিলতে পারেনি। ঠিক তখনই হারিয়াখালী সড়কের দিক থেকে ভেসে আসে চিৎকার, চেঁচামেচি আর হট্টগোলের বিকট শব্দ। কী ঘটছে তা দেখতেই মাংসের টুকরোটি মুখে নিয়েই ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে যায় ইব্রাহিম। কিন্তু সে জানত না, বাইরের সেই কোলাহল আসলে ছিল এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রণক্ষেত্র। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ প্রশাসন থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ওই দিন বিকেলেই। শাহপরীর দ্বীপ-হারিয়াখালী সড়কের ৩ নম্বর ব্রিজ এলাকায় তুচ্ছ বিষয় নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন তরুণের মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। পূর্বশত্রুতার জের ধরে সেই ক্ষোভ রাতের অন্ধকারে রূপ নেয় এক ভয়াবহ ও সহিংস সংঘর্ষে। দুই পক্ষের যুবকেরা লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র ও ইটপাটকেল নিয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হয় এবং শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া।

ঠিক এই সংঘর্ষের মাঝখানেই এসে পড়েছিল নিরীহ কিশোর ইব্রাহিম। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে দুই পক্ষের প্রতিহিংসার বলি এবং নির্মম মারধরের শিকার হয়। এলোপাতাড়ি ইটপাটকেলের আঘাত এবং লাঠির ঘায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ইব্রাহিমকে উদ্ধার করে দ্রুত টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, অ্যাম্বুলেন্সে করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে ইব্রাহিম।

ছেলের এই অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে মা নুর নাহার বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন এবং প্রলাপ বকছেন। তাঁর চোখের জল যেন আর থামছেই না। তিনি বিলাপ করতে করতে বলছিলেন যে, তাঁর ছেলে কোনো দল বা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল না, কারও সঙ্গে তার কোনো শত্রুতাও ছিল না। শুধু সামান্য কৌতূহল আর কোলাহলের উৎস দেখতে গিয়েই তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো। নুর নাহার বেগম স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, স্থানীয় কিছু চিহ্নিত বখাটে যুবক তাঁর নিরীহ ছেলেকে অন্যায়ভাবে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করেছে এবং তিনি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও ফাঁসি দাবি করেন।

এদিকে খবর পেয়ে টেকনাফ মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই সহিংসতার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে রবিউল আলম নামের চব্বিশ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। টেকনাফ মডেল থানার পরিদর্শক সুকান্ত চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, তুচ্ছ ঘটনা ও পূর্বশত্রুতার জের ধরেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত। তিনি আরও জানান, কিশোরের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং এই ঘটনার পেছনে থাকা অন্য সব আসামিকে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। একটি সাজানো উৎসবের দিন কীভাবে এক মুহূর্তের সহিংসতায় একটি পরিবারের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, টেকনাফের এই নির্মম ঘটনাই যেন আবারও তার এক জ্বলন্ত ও বেদনাদায়ক উদাহরণ হয়ে রইল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement