সংবাদ শিরোনাম

রায়পুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড: এক কবরেই মা ও তিন মেয়ের শেষ ঠিকানা, বিচার দাবিতে স্বজনদের আহাজারি

 প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ০৮:২১ পূর্বাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

রায়পুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড: এক কবরেই মা ও তিন মেয়ের শেষ ঠিকানা, বিচার দাবিতে স্বজনদের আহাজারি

নিজস্ব প্রতিবেদক

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার শাহীনুর বেগম ও তাঁর তিন মেয়েকে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার নিজ গ্রাম লটিয়ায় পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর কান্নায় পুরো এলাকা শোকাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।

নিহতরা হলেন শাহীনুর বেগম (৩৮), তাঁর বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)।

পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তান জুনায়েদ ইসলাম সিফাত মায়ের ও তিন বোনের জানাজায় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "আমি আমার মা ও বোনদের হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। নিহত অন্তর মজুমদার ছাড়াও যদি এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকে, তাদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। সবাই আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন।"

শাহীনুর বেগমের মা হাজরা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "আমার মেয়ে ও নাতনিদের যারা হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।"

একই দাবি জানান শাহীনুরের শাশুড়িও। তিনি বলেন, "আমার ছেলের স্ত্রী ও নাতনিদের কী অপরাধ ছিল? যারা এ নৃশংসতা করেছে, তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।"

এর আগে শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো অ্যাম্বুলেন্সে করে লটিয়া গ্রামে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। শেষবারের মতো প্রিয়জনদের দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) টমাস বড়ুয়া জানান, জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে মা ও তাঁর তিন মেয়েকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।

যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড

গত বৃহস্পতিবার সকালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই শাহীনুর বেগম, ইকরা ও শিফার মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বড় মেয়ে সায়মাও মারা যান।

ঘটনার পর স্থানীয়রা এক যুবককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই যুবকেরও মৃত্যু হয়েছে। তবে তার পরিচয় এবং হত্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

দুটি মামলা দায়ের

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুক্রবার দুপুরে নিহত শাহীনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম সিফাত বাদী হয়ে নিহত অন্তর মজুমদারসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এদিকে অভিযুক্তকে উদ্ধার করতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে সাত পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় থানার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল মান্নান বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি মামলা করেছেন।

তদন্ত চলছে

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শাহীনুর বেগমের স্বামী মো. কামালের মৃত্যু হয়। এরপর তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তিনি রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।

পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ, এতে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না এবং সন্দেহভাজনকে ঘিরে গণপিটুনির ঘটনাসহ পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।