দক্ষিণ আফ্রিকার নারীদের লড়াই এখনো শেষ হয়নি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৫৬ সালের ৯ আগস্ট এক অবিস্মরণীয় দিন। সেদিন প্রায় ২০ হাজার নারী প্রিটোরিয়ার ইউনিয়ন বিল্ডিংসে মিছিল করে বর্ণবাদী সরকারের পাস আইন সম্প্রসারণের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ওই আইনের আওতায় কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের চলাচলও নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তখন ১৮ বছরের তরুণী সোফি উইলিয়ামস-ডি ব্রুইন ছিলেন সেই ঐতিহাসিক মিছিলের অন্যতম নেতা। ৭০ বছর পর, গত রোববার ৮৮ বছর বয়সে তিনি আবার দাঁড়ালেন একই জায়গায়।
সময়ের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা বদলেছে। বর্ণবাদী শাসনের অবসান হয়েছে, দেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। নারীরা দেশটির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদেও পৌঁছেছেন।
তবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতায় অংশগ্রহণের এই অগ্রগতি দেশের অধিকাংশ নারীর জীবনে সমান নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সুযোগ কিংবা নির্ভরযোগ্য সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে পারেনি।
জাতীয় নারী দিবসের ৭০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে উইলিয়ামস-ডি ব্রুইন প্রশ্ন তোলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতা যখন এতটাই হতাশাজনক ও কষ্টদায়ক, তখন আমরা অতীতের বিজয় পুরোপুরি উদ্যাপন করব কীভাবে?’
১৯৫৬ সালের মিছিলের অর্জন
১৯৫৬ সালের নারীদের সেই মিছিল ছিল বর্ণবাদী শাসনের অন্যতম দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ। পাস আইন নির্ধারণ করত, কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানরা কোথায় বসবাস ও কাজ করতে পারবেন। সরকার তখন সেই বিধিনিষেধ কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ওপরও আরোপের উদ্যোগ নেয়।
মিছিলকারীরা ইউনিয়ন বিল্ডিংসে তাদের দাবিসংবলিত স্মারকলিপি জমা দেন। এরপর ৩০ মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে তারা সেখান থেকে চলে যান। সেই প্রতিবাদ পরবর্তী সময়ে নারীর প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়। প্রতিবছর ৯ আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতীয় নারী দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হয়।
প্রায় চার দশক পর অবসান ঘটে বর্ণবাদী শাসনের। ১৯৯৪ সালের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সংবিধানে সমতা ও মানবিক মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এরপর সংসদে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। সরকার, বিচার বিভাগ ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদেও নারীরা দায়িত্ব নিতে শুরু করেন।
রোববারের অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। দেশটির প্রধান বিচারপতি, পার্লামেন্টের স্পিকার ও পাবলিক প্রটেক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও এখন নারী রয়েছেন।
তবে রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় সমতা আনতে পারেনি।রামাফোসা বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী হলেও দেশের সম্পদ, জমি ও ব্যবসার সমান অংশ এখনো তাদের হাতে নেই।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রচারক ক্যাসান্দ্রা দোরাসামিও মনে করেন, নারীর প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ নারীর দৈনন্দিন জীবনে তার প্রতিফলন খুব কম।
সহিংসতা আর আতঙ্ক
দক্ষিণ আফ্রিকার নারীদের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা।
পুলিশের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের ৯ হাজার ৭৮২টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ছিল ১২ হাজার ৫৯০টি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০৮টি ধর্ষণের অভিযোগ পুলিশের কাছে এসেছে।
নথিভুক্ত ধর্ষণের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ ৪ হাজার ৬২০টি ঘটনা ঘটেছে ভুক্তভোগী অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িতে।
নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির পর গত বছরের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সেন্টার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও নারীহত্যাকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে।
রামাফোসা বলেন, নারীরা এখনো ‘রাস্তায়, এমনকি নিজেদের ঘরেও’ সহিংসতার আশঙ্কা নিয়ে বসবাস করেন।
তবে অধিকারকর্মীদের মতে, জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করাই সমাধান নয়। দোরাসামি জানান, সহিংসতার শিকার অনেক নারী থানায় মামলা করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়েন। অভিযোগ জানালেও অনেকে যথাযথ গুরুত্ব পান না কিংবা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পান না।
প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠায় অনেক নারী শেষ পর্যন্ত মামলা প্রত্যাহার করে নেন বলেও জানান তিনি।
অর্থনীতিতেও পিছিয়ে নারীরানারীদের জন্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে তা ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের বেকারত্বের হার ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান নারীদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার আরও বেশি-৪০ দশমিক ৫ শতাংশ।শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীরা পুরুষদের চেয়ে পিছিয়ে। নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ, পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীদের ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ কোনো চাকরি, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণে নেই। তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৬ শতাংশ।
বেকারত্বের কারণে অনেক নারী আর্থিকভাবে পরিবারের সদস্য বা সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এতে সন্তানদের ভরণপোষণ করা কঠিন হয়, একই সঙ্গে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পথও সংকুচিত হয়ে যায়।
দরিদ্র ও গ্রামীণ এলাকায় জমি, উৎপাদনশীল সম্পদ এবং নির্ভরযোগ্য সরকারি সেবার সীমিত সুযোগ এসব চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই বৈষম্যের শিকড় বর্ণবাদী শাসন ও তার আগের সময়ের বর্ণভিত্তিক ভূমি দখল ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাসে। কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের জমি, পুঁজি ও অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন দূরে রাখা হয়েছিল। বৈষম্যমূলক আইন ও সামাজিক কাঠামোর কারণে নারীরা আরও বেশি বাধার মুখে পড়েছিলেন।
গণতন্ত্র রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলেছে, কিন্তু কয়েক দশকের অর্থনৈতিক বঞ্চনার ক্ষত পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি।
যে স্বাধীনতার জন্য লড়াইএই বাস্তবতাই উইলিয়ামস-ডি ব্রুইনের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল।
তিনি বলেন, বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও অনেক নারী যেন নিজেদের ঘরেই বন্দী। দারিদ্র্য, গৃহহীনতা, নিরাপদ পানির সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
‘নারী হিসেবে, বর্ণ ও শ্রেণির কারণে আমাদের ওপর যে কাঠামোগত নিপীড়নের জোয়াল ছিল, তা ভাঙার জন্য আমরা লড়াই করেছি’-বলেন তিনি।
তার বক্তব্যের পর উপস্থিত মানুষ দাঁড়িয়ে করতালি দেন।
এবারের জাতীয় নারী দিবসের আয়োজনে আন্তর্জাতিক মাত্রাও যোগ হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মালালা ইউসুফজাই।
রামাফোসা মালালার সাহসের প্রশংসা করেন এবং আফগানিস্তানের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনজীবন থেকে পদ্ধতিগতভাবে বাদ পড়া নারী ও কিশোরীদের প্রতি সংহতি জানান।
তবে অনুষ্ঠানের শেষেও সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হয়েছে উইলিয়ামস-ডি ব্রুইনের কথাই।সত্তর বছর আগে বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া নারীদের কাছে আজকের দক্ষিণ আফ্রিকার বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। নারীরা এমন সব ক্ষমতাশালী পদে পৌঁছেছেন, যা বর্ণবাদের সময়ে প্রায় অকল্পনীয় ছিল
কিন্তু লাখো নারীর জীবনে এখনো সহিংসতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অপর্যাপ্ত সরকারি সেবাই স্বাধীনতার বাস্তব অর্থ নির্ধারণ করছে।
উইলিয়ামস-ডি ব্রুইনের ভাষায়, ‘আমরা যে স্বাধীনতার জন্য মিছিল করেছিলাম, এটি সেই স্বাধীনতা নয়।’
সূত্র:আলজাজিরা