বিরল অভ্যর্থনায় ওয়াশিংটনে শি জিনপিং, ট্রাম্প বললেন মহান নেতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ওয়াশিংটনের উপকণ্ঠে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে তাঁর বিমান অবতরণের পর নজিরবিহীনভাবে সরাসরি উড়োজাহাজের পাশে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
শি জিনপিংয়ের এই সফরের আগেই দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন। এই সমঝোতার আওতায় দুই দেশ শুল্ক কমিয়ে আনা এবং নতুন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
ট্রাম্প শিকে স্বাগত জানানোর সময় মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বর্তমান সমঝোতার আওতা আরও বাড়ানো হবে কি না, তা তিনি জানেন না। তবে মেয়াদ বাড়ানোর ফলে দুই নেতার আলোচনার জন্য আরও সময় পাওয়া যাবে। আগামী নভেম্বরে চীন এবং ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় তাঁদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
লাল গালিচা, সামরিক অভিবাদন
শিকে স্বাগত জানাতে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে প্রায় ১০০ ফুট বা ৩০ মিটার দীর্ঘ লাল গালিচা বিছানো হয়। বিমানের দরজার সিঁড়ির দুই পাশে ২১ সদস্যের সামরিক সম্মানরক্ষী দল দাঁড়িয়ে ছিল।
বিমান থেকে নামার পর শি ও তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে করমর্দনের মাধ্যমে স্বাগত জানান ট্রাম্প ও মেলানিয়া। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে দুটি বি-১ বোমারু বিমানের উড্ডয়ন, সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখার প্লাটুন এবং দুই দেশের পতাকা ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনও ছিল।
ট্রাম্প ও শি পরস্পরের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন। তবে তাঁদের কথোপকথন শোনা যায়নি। বাইরে তাপমাত্রা ছিল ৬৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া হলেও ট্রাম্পের পরনে ছিল গ্লাভস ও ওভারকোট। শির সঙ্গে করমর্দনের সময় তিনি এক হাতের গ্লাভস খুলে ফেলেন। একপর্যায়ে শির পিঠে হাত চাপড়ে তাঁকে কিছু বলেন, তবে তা শোনা যায়নি।
হোয়াইট হাউসে ফিরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, তাঁরা এটির প্রশংসা করেছেন। তাঁরা অসাধারণ মানুষ।
প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে দেওয়া এক বিবৃতিতে শি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ হওয়া উচিত।
চীনা নেতা বলেন, চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ এবং ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলা’-দুটি লক্ষ্য পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে। দুই দেশ একে অন্যের সাফল্যে অবদান রাখতে পারে এবং এর সুফল বৃহত্তর বিশ্বেরও পাওয়া সম্ভব।
তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাম্প চলতি বছরের মে মাসে চীন সফর করার পর শির এই সফরকে তারই আনুষ্ঠানিক পাল্টা আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের আড়ালে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনও স্পষ্ট। বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের যুদ্ধ এবং তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান-বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের বিরোধ তীব্র।
শিকে নিয়ে ট্রাম্পের প্রশংসা, সমালোচনাও
দুই দেশের মধ্যে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার চেষ্টা হিসেবে সফরটিকে কাজে লাগাতে চাইছেন ট্রাম্প। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি শিকে ‘মহান নেতা’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্কের কথা বলেছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা শিকে দেওয়া এই জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনার সমালোচনা করেছেন।
সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান ও রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার বলেছেন, চীন ও প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘উদ্বেগজনক’ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এমন আমন্ত্রণ দেওয়া উচিত হয়নি।
মঙ্গলবার সিনেটে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে ট্রাম্প চাইলে চীনের বিশাল সামরিক শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্য কিংবা ইরানের প্রতি বেইজিংয়ের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে শির সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতি এবং সম্ভবত বিশ্বের দুটি সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের কূটনীতিক ড্যানি রাসেল অবশ্য শিকে দেওয়া বিমানবন্দরের অভ্যর্থনাকে চীনের জন্য প্রচারণাগত সাফল্য হিসেবে দেখেছেন।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটে বর্তমানে কর্মরত রাসেলের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন মাত্রার সম্মান প্রদর্শন চীনের নেতা এবং শির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উচ্চ মর্যাদাবোধের প্রমাণ হিসেবে বেইজিং দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যবহার করতে পারে।
ট্রাম্পের চাওয়া ছিল আরও জাঁকজমক
শিকে চমকে দিতে ট্রাম্প যে বড় আয়োজন করতে চেয়েছেন, তা তিনি আগেই স্পষ্ট করেছিলেন। নতুন নির্মিত ‘শিল্পকর্মের মতো’ হেলিকপ্টার অবতরণস্থল সফরের সময় প্রস্তুত থাকবে বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তবে হোয়াইট হাউসের বিশাল বলরুমটি তখনও প্রস্তুত না হওয়ায় আক্ষেপ করেছিলেন।
বুধবারও তিনি বলেন, ‘ইশ, আগামীকাল রাতের জন্য যদি এটি প্রস্তুত থাকত। প্রেসিডেন্ট শির জন্য আগামীকাল রাতে আমাদের ঘর পুরোপুরি ভর্তি থাকবে।’
চলতি বছরের মে মাসে ট্রাম্প যখন চীন সফর করেন, তখন তাঁকে যে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়েছিল, এবার শিকে স্বাগত জানানোর আয়োজনেও তার ছাপ ছিল।
তবে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে শি নিজে বিমানবন্দরে যাননি। চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বেইজিংয়ে ট্রাম্পের এয়ার ফোর্স ওয়ান অবতরণের পর লাল গালিচা বিছানো হয়েছিল। সামরিক সম্মানরক্ষী দল, সামরিক ব্যান্ড এবং প্রায় ৩০০ চীনা তরুণ-তরুণী চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে ‘স্বাগতম, স্বাগতম! উষ্ণ স্বাগতম!’ স্লোগান দিয়েছিলেন। তাঁদের সাদা ও হালকা নীল পোশাক ছিল প্রেসিডেন্টের বিমানের ঐতিহ্যবাহী রঙের সঙ্গে মিল রেখে।
মেলানিয়া ট্রাম্প এর আগে ফক্স নিউজ চ্যানেলের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, শিকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছেন কারণ তাঁদের মধ্যে ‘দারুণ সম্পর্ক’ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের মাটিতে আসছেন, তাই আমাদের তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে স্বাগত জানাতে হবে।’
পুতিনের সফরের কথাও মনে করাল অভ্যর্থনা
শির জন্য বিছানো দীর্ঘ লাল গালিচা গত বছরের গ্রীষ্মে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দেওয়া অনুরূপ অভ্যর্থনার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের চেষ্টা নিয়ে বৈঠকের জন্য পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছালে তাঁকেও দীর্ঘ লাল গালিচায় স্বাগত জানানো হয়েছিল।
২০২৫ সালের আগস্টে পুতিন পৌঁছানোর পর ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দন করেন। এরপর দুজন একসঙ্গে ট্রাম্পের লিমুজিনে উঠে আলোচনার ভবনে যান, যা ছিল বেশ অস্বাভাবিক দৃশ্য।
বুধবার অবশ্য শি ও পেং নিজেদের গাড়িতে ওঠেন। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান শেষে ট্রাম্প ও মেলানিয়াও তাঁদের গাড়িতে ফিরে যান।
সামনে নৈশভোজ, বৈঠক ও আর্কাইভ পরিদর্শন
শিকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর পর বৃহস্পতিবার আরও আনুষ্ঠানিক আয়োজন রয়েছে। হোয়াইট হাউসে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান এবং সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন দুই নেতা।
এরপর হবে আনুষ্ঠানিক পোশাকের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ। সেখানে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদেরও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। অতিথিদের তালিকায় এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এবং স্পেসএক্সের ইলন মাস্কের নাম রয়েছে।
নৈশভোজের আগে ট্রাম্প ও শি বন্ধ দরজার বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই সফর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে বড় কোনো অগ্রগতি আসবে-এমন প্রত্যাশা খুব বেশি নেই।
শুক্রবার শি ও পেং আবার হোয়াইট হাউসে যাবেন। সেখানে ট্রাম্প ও মেলানিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত চা-চক্রে অংশ নেওয়ার পর তাঁরা ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শন করবেন।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সেখানে দুই দেশের সম্পর্কের ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি দেখবেন দুই দেশের নেতারা।
সূত্র: আরব নিউজ