সংবাদ শিরোনাম

পশ্চিম তীরের নিষেধাজ্ঞায় ব্রিটেনকে নিন্দা করে মার্কিন খসড়া

 প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১২ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

পশ্চিম তীরের নিষেধাজ্ঞায় ব্রিটেনকে নিন্দা করে মার্কিন খসড়া ছবি- সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা করায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার সমালোচনা করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নামে একটি বিবৃতি তৈরি করা হয়েছিল। তবে সেই খসড়া বিবৃতি শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।

রয়টার্সের দেখা ৮ সেপ্টেম্বর তারিখের ওই খসড়ায় বলা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পদক্ষেপ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একের পর এক ‘শত্রুতামূলক ব্যবস্থা’ এবং এসব পদক্ষেপ ইহুদিবিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে।

খসড়ায় রুবিওর নামে বলা হয়েছিল, এসব কৌশল ‘ইহুদিবিদ্বেষী বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা আন্দোলনের কৌশল’ থেকে নেওয়া, যা গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ নেতৃত্ব ওই বিবৃতিকে সমর্থন করেনি। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য জানিয়েছেন।

রুবিও প্রকাশ্যে নরম অবস্থান নেন

খসড়াটি তৈরি হওয়ার দিনই ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন রুবিও। লাতিন আমেরিকা সফরে যাওয়ার আগে তিনি যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তের সরাসরি সমালোচনা করেননি। কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধেও মন্তব্য করেননি।

রুবিও বলেছিলেন, ‘অবশ্যই আমরা যুক্তরাজ্য যা করেছে, তা করব না। আজ তাদের ঘোষণা আমরা দেখেছি, কিন্তু এ মুহূর্তে এ নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

এই ঘটনা ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের মতপার্থক্য সামনে এনেছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী সরকারের বসতি নীতির জবাব কীভাবে দেওয়া উচিত, তা নিয়ে হোয়াইট হাউস ও ইসরায়েলে নিযুক্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতিকদের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়েছে।

একই সঙ্গে ইসরায়েলকে সমর্থনের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরেও মতাদর্শগত বিভাজন বাড়ছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে।

হাকাবির ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ভূমিকা

খসড়াটি তৈরির পেছনে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির প্রভাবশালী সহযোগী ডেভিড মিলস্টেইনের ভূমিকা ছিল বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।

হাকাবি একজন ব্যাপটিস্ট ধর্মযাজক এবং ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের দৃঢ় সমর্থক। পশ্চিম তীরকে তিনি প্রায়ই এর বাইবেলীয় নাম ‘জুডিয়া অ্যান্ড সামারিয়া’ বলে উল্লেখ করেন। ইসরায়েল সরকারও এই নাম ব্যবহার করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই নাম গ্রহণ করেনি।

গত বছর মিলস্টেইন যুক্তি দিয়েছিলেন, গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্তের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে আদালতকে ওই মামলা থেকে সরে যেতে চাপ দেওয়া যেত। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো এমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, খসড়া বিবৃতিটি পররাষ্ট্র দপ্তর বা হোয়াইট হাউসের সঙ্গে পরামর্শ করে তৈরি করা হয়নি।

মার্কিন দূতাবাস হাকাবি ও মিলস্টেইনের মন্তব্যসহ এ বিষয়ে করা প্রশ্ন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে পাঠিয়ে দেয়। হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

ইসরায়েল নিয়ে মার্কিন জনমতেও পরিবর্তন

২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন কমেছে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে।

জুনে কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির এক জরিপে ৪৮ শতাংশ মার্কিন ভোটার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ মত পোষণ করেন ৬৬ শতাংশ। ২০১৭ সালে একই প্রশ্ন করা হলে এ হার ছিল যথাক্রমে ১৬ ও ২০ শতাংশ।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের মার্চের শেষ দিকের এক জরিপেও রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রজন্মগত পার্থক্য দেখা যায়। ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী রিপাবলিকানদের বড় অংশ ইসরায়েলকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের ৫৭ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মত দিয়েছেন। এক বছর আগে এই হার ছিল ৫০ শতাংশ।

বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান

গত বছরের ডিসেম্বরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, পশ্চিম তীরের বিষয়ে তাঁর ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে পুরোপুরি একমত হওয়া হয়নি। নেতানিয়াহুর সরকার ওই সময় পশ্চিম তীরে বসতি দ্রুত সম্প্রসারণ করছিল।

এর কয়েক মাস আগে, সেপ্টেম্বরে, ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি ইসরায়েলকে পশ্চিম তীর দখল করে নেওয়ার অনুমতি দেবেন না।

তবে ট্রাম্প বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করলেও তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলকে নীতি পরিবর্তনে খুব বেশি চাপ দেয়নি। বিষয়টি ইসরায়েলের আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।

পশ্চিম তীরের অবস্থান

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। জাতিসংঘ ও অধিকাংশ দেশ সামরিক দখলদারিত্বের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ইসরায়েলি বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করে। ইসরায়েল অবশ্য এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে। দেশটির দাবি, পশ্চিম তীর ‘দখলকৃত’ নয়, বরং বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ড।

চলতি বছর পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর কিছু ঘটনায় নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকারের সমর্থন তাদের উৎসাহিত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী নিজেরাও পশ্চিম তীরের বসতিতে বসবাস করেন।

হাকাবি প্রকাশ্যে এসব সহিংসতার নিন্দা করেছেন এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, সহিংসতায় জড়িত বসতিস্থাপনকারীরা সংখ্যালঘু এবং তারা পুরো বসতিস্থাপনকারী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে না।

পশ্চিম তীরে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী এবং ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরে গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমের পাশাপাশি পশ্চিম তীরকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছেন।

সূত্র: আরব নিউজ