সমুদ্রপথে অবৈধ বিদেশযাত্রা বন্ধে সর্বাত্মক উদ্যোগের আহ্বান
কক্সবাজার প্রতিনিধি: উন্নত জীবনের স্বপ্ন আর অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার আশায় অনেক মানুষ দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন। এই বিপজ্জনক যাত্রায় কেউ মানবপাচারের শিকার হচ্ছেন, কেউ নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে পড়ছেন, আবার অনেকের জীবন শেষ হচ্ছে সাগরের অতল গহ্বরে। এমন পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, দেশের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার কক্সবাজারের সায়মন বিচ রিসোর্টে আয়োজিত ‘সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা, রুখতে হবে এখনই’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহায়তায় ব্র্যাক ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসন দেশের জন্য বড় ধরনের মানবিক ও সামাজিক সংকট সৃষ্টি করছে। তিনি জানান, উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই জমি বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে দালালদের হাতে অর্থ তুলে দেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তাঁদের অনেককে অপহরণ, জিম্মি ও চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের ন্যূনতম খাদ্য ও পানির ব্যবস্থাও থাকে না। কেউ মাঝপথে প্রাণ হারান, আবার যারা কোনোভাবে গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছান, তাঁদের অনেকেই বিদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ।
বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে দেশে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতামূলক প্রচার জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, জেলার উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবহার করে অবৈধ বিদেশযাত্রা ঠেকাতে প্রশাসন কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের ক্যাম্প ইনচার্জ সুরাইয়া আক্তার সুইটি বলেন, শুধু বাংলাদেশি নয়, রোহিঙ্গাদের মধ্যেও সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের ‘ভালো বিয়ের’ প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, কক্সবাজার অবৈধ অভিবাসনের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন এনে গোপনে রাখা হয় এবং পরে ছোট নৌকায় করে গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলার বা জাহাজে তোলা হয়। সেখানে শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া অবৈধ বিদেশযাত্রা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
‘লজ্জার শীর্ষে বাংলাদেশ’
গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান। তিনি বলেন, সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বর্তমানে সর্বাধিক। দেশের জন্য এটি অত্যন্ত বিব্রতকর বাস্তবতা।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১১ সালের দিকে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের গণকবর আবিষ্কারের ঘটনা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
শরিফুল ইসলাম বলেন, যেমন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশে অ্যাসিড-সন্ত্রাস অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে, তেমনি সবাই মিলে কাজ করলে সমুদ্রপথে অবৈধ বিদেশযাত্রাও রোধ করা সম্ভব।
প্রতারণার শিকার হয়ে ফিরে আসা
অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন প্রতারণার শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগী।
অং অং উ জুয়েল জানান, কলেজে পড়াকালীন দালালদের প্রলোভনে পড়ে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এ জন্য তাঁর পরিবার প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয় করে। কিন্তু মিয়ানমারে পৌঁছানোর পর তিনি পুলিশের হাতে আটক হন এবং কারাগারে যেতে হয়। পরে দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরে এলেও তাঁর জীবন ও শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্য ভুক্তভোগী মহেশখালীর তারেকুর রহমান বলেন, ভালো চাকরির আশ্বাস দিয়ে তাঁকে মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পথে দালালরা বিভিন্ন ধাপে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা আদায় করে। শেষ পর্যন্ত সীমান্তে ধরা পড়ে কারাভোগের পর দেশে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।
গোলটেবিল বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা সমুদ্রপথে অবৈধ বিদেশযাত্রা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।