মরক্কোর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন লেকজা?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
২৩ সেপ্টেম্বরের সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মরক্কোর রাজনীতিতে এখন আদর্শ বা দলীয় কর্মসূচির চেয়ে বেশি আলোচনায় দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী এক কর্মকর্তার রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশের সিদ্ধান্ত। বাজেটবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রয়্যাল মরোক্কান ফুটবল ফেডারেশনের (এফআরএমএফ) সভাপতি ফৌজি লেকজার একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়াকে ঘিরে জোরালো হয়েছে তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে জল্পনা।
লেকজা সম্প্রতি অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টিতে (পিএএম) যোগ দিয়েছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত মরক্কোর রাজনৈতিক মহল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সবখানেই ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
সরকারি অর্থব্যবস্থা ও মরক্কোর ফুটবলের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য পরিচিত লেকজা এত দিন নির্বাচনী রাজনীতির চেয়ে প্রশাসনিক দক্ষতার কারণেই বেশি পরিচিত ছিলেন। পিএএমে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সেই পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি দলীয় রাজনীতি যুক্ত হলো।
ইবনে জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবিধানিক আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান গবেষক মুস্তাফা আহদার আল জাজিরাকে বলেন, নির্বাচনের তিন মাসেরও কম সময় আগে লেকজার পিএএমে যোগ দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, ২০১১ সালের সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক মরক্কোর নাগরিকের যেকোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু একই ব্যক্তি যখন জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান এবং সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীও, তখন তাঁকে রাজনীতিতে আসা একজন সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে একইভাবে দেখা যায় না।
লেকজার রাজনীতিতে প্রবেশের সময়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অন্য একটি কারণে। নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হবে, সেই সরকারই ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতির দায়িত্বে থাকবে। মরক্কো স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে এই বিশ্বকাপ আয়োজন করবে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশা রয়েছে। তাই বিশ্লেষকদের কেউ কেউ পরবর্তী সরকারকে ইতিমধ্যে ‘বিশ্বকাপ সরকার’ হিসেবে অভিহিত করছেন। অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজনের সক্ষমতাও এই সরকারের মূল্যায়নের বড় মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।
দলীয় রাজনীতি থেকে কর্মদক্ষতার রাজনীতি
লেকজার উত্থান মরক্কোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনীতিতে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের দিকও তুলে ধরছে। সফল সরকারি কর্মকর্তারা ক্রমেই নিজেদের রাজনৈতিক দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠছেন।
বাজেটবিষয়ক দায়িত্ব পালনের সময় লেকজা বড় অবকাঠামো ও বিনিয়োগ প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। একই সময়ে মরক্কোর ফুটবলের সাফল্যেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে মরক্কোর জাতীয় দলের ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল যাত্রা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ভাবমূর্তিতে বড় পরিবর্তন আনে। আফ্রিকা ও আরব বিশ্বে মরক্কোর প্রভাব বাড়ে। ফুটবল হয়ে ওঠে জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রতীক।
তবে আহদারের মতে, এই প্রবণতা রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ হওয়া উচিত নাগরিকদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলা। রাজনীতির বাইরে জনপ্রিয়তা অর্জন করা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দলে টানার প্রবণতা বাড়লে দলগুলো সেই দায়িত্ব থেকে সরে যেতে পারে।
তরুণ ভোটারদের অনাগ্রহ
মরক্কোর রাজনীতিতে ভোটারদের আচরণেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালের সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৫০ শতাংশ ছাড়ালেও যোগ্য ভোটারদের প্রায় অর্ধেক ভোট দিতে যাননি।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এর পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থা বড় কারণ। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার ও বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রকাশ করছে।
আহদারের মতে, লেকজাকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কও এই পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরছে।
তিনি বলেন, পিএএম বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটের অংশ এবং সরকারের কার্যক্রম নিয়ে দলটি সমালোচনার মুখে রয়েছে। কিন্তু এখন দলটির কর্মসূচি বা সরকারের অর্জনের চেয়ে লেকজার যোগদানই বেশি আলোচনায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ মজা করে বলছেন, ‘পিএএম লেকজাকে আকর্ষণ করেনি, বরং লেকজাই পিএএমকে আকর্ষণ করেছেন।’ আহদারের মতে, এই মন্তব্য রাজনীতিতে ব্যক্তিনির্ভরতার প্রবণতা বাড়ার বিষয়টিই তুলে ধরে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ কতটা খোলা?
মরক্কোর ২০১১ সালের সংবিধান সংসদের ক্ষমতা বাড়ালেও সরকার গঠনে রাজতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ভূমিকা বহাল রেখেছে। সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতা বা সদস্যকে রাজা সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন।
মরক্কোর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় সাধারণত কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। ফলে নির্বাচনের পর জোট সরকার গঠনের আলোচনা ভোটের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
লেকজাকে সরকারপ্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে-এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত অবশ্য এখনো নেই। তবু তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
এ ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আজিজ আখান্নুশের সঙ্গে তাঁর কিছুটা মিলও টানা হচ্ছে। আখান্নুশও প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করার পর দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
আহদার বলেন, এ ধরনের ঘটনা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অনেক দলীয় কর্মী বছরের পর বছর দলের ভেতরে কাজ করে নেতৃত্বের পর্যায়ে ওঠেন। অথচ রাজনীতির বাইরের পরিচিত ব্যক্তিরা কখনো কখনো খুব দ্রুত শীর্ষ পদে পৌঁছে যান।
এ ধরনের পদক্ষেপ সত্যিকারের রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে নেওয়া, নাকি বাস্তব রাজনৈতিক হিসাবের ফল-সেটিও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
লেকজাকে ঘিরে পিএএমের হিসাব
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পিএএম নিজেকে আধুনিকায়নপন্থী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। প্রতিষ্ঠান সংস্কার, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন দলটির ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
তবে দলটির নির্বাচিত কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।
কার্যকর প্রশাসন ও ফুটবলের সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত লেকজাকে দলে নেওয়া পিএএমের দক্ষতার ভাবমূর্তি জোরদার করতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন জোটের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা থেকে জনমতের দৃষ্টি কিছুটা সরানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
দক্ষতা বনাম জন প্রত্যাশা
প্রশাসনিক দক্ষতা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে। কিন্তু সরকার পরিচালনার জন্য শুধু ব্যবস্থাপনার দক্ষতাই যথেষ্ট নয়। মরক্কোকে এখনো বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আঞ্চলিক বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আরব সেন্টার ফর রিসার্চের প্রধান নুহ এল হারমুজির মতে, লেকজার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাই তাঁর রাজনৈতিক প্রবেশকে এত আলোচনায় এনেছে।
তিনি বলেন, সরকারি অর্থব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত পরিকল্পনায় লেকজার মতো অভিজ্ঞতা একসঙ্গে খুব কম জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার রয়েছে।
নতুন সরকারকে একদিকে বড় বাজেটের চাপ ও বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামলাতে হবে, অন্যদিকে মরক্কোর আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প-২০৩০ বিশ্বকাপ-সফলভাবে আয়োজন করতে হবে।
প্রবাসীদের নজরও নির্বাচনে
লেকজার রাজনৈতিক পদক্ষেপ মরক্কোর প্রবাসী নাগরিকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। মরক্কো-ফরাসি প্রযুক্তিবিদ তুরিয়া গুয়েরাউই বলেন, ফুটবলের কারণে লেকজার জনপ্রিয়তা প্রবাসীদের মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক পদক্ষেপকে বিশেষভাবে আলোচনায় এনেছে।
তাঁর মতে, বিদেশে বসবাসকারী অনেক মরক্কোর নাগরিক জাতীয় দলের সাফল্য গভীরভাবে অনুসরণ করেন এবং সেই সাফল্যের সঙ্গে নিজেদেরও যুক্ত মনে করেন। ফলে লেকজার পিএএমে যোগদানের সিদ্ধান্ত তাঁদের অনেককে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আরও আগ্রহী করেছে।
তবে ফুটবলে প্রশাসনিক সাফল্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে কতটা রূপ দিতে পারবেন লেকজা-এখন সেই প্রশ্নও উঠছে। কারণ জাতীয় দলের সাফল্য যে বিপুল গর্ব তৈরি করেছে, তার সঙ্গে নাগরিকদের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবা নিয়ে প্রত্যাশাও বেড়েছে।
সূত্র:আলজাজিরা