সাংবাদিক দিবসেও ইরানে গ্রেপ্তার, কারাদণ্ডের চাপ

 প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

সাংবাদিক দিবসেও ইরানে গ্রেপ্তার, কারাদণ্ডের চাপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানে বার্ষিক সাংবাদিক দিবস পালিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন অনেক সাংবাদিক কারাগারে, কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি সাজা পেয়েছেন এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরকারি চাপ আরও বেড়েছে। দেশটিতে চলতি বছরের শুরুতে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর সংবাদকর্মীদের ওপর ধরপাকড় ও দমন-পীড়ন আরও তীব্র হয়েছে বলে জানিয়েছে অধিকার সংগঠনগুলো।

আটক সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন ফটোসাংবাদিক আরতিন গাজানফারি। তথ্যের অবাধ প্রবাহ রক্ষায় কাজ করা সংগঠন ডিফেন্ডিং ফ্রি ফ্লো অব ইনফরমেশনের (ডেফি) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাত মাস ধরে তিনি আটক রয়েছেন। গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে গ্রেটার তেহরান কারাগারে রাখা হয়েছে।

বাহাই ধর্মাবলম্বী গাজানফারি হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানিতে ভুগছেন। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) জানিয়েছে, গত ১৮ জানুয়ারি তেহরানের নিজ বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়েছে কি না, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আমিরহোসেইন রেজাইও তিন মাসের বেশি সময় ধরে অস্থায়ী আটক অবস্থায় রয়েছেন। অধিকার সংগঠন হেংগাও জানিয়েছে, গত ৬ মে আরাক শহরে তাঁর পরিবারের বাড়ি থেকে নিরাপত্তা বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

ফটোসাংবাদিক ইয়ালদা মোয়েরিও এ সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তেহরানের বিপ্লবী আদালতের ২৯ নম্বর শাখা তাঁকে অনুপস্থিতিতে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।

বিক্ষোভের পর আরও কঠোর দমন

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের আগে থেকেই ইরানে সাংবাদিক ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর চাপ ছিল। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে জানুয়ারিতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার সময় ৮ জানুয়ারি কর্তৃপক্ষ প্রায় পুরো দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। এতে সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং দেশের বড় অংশ বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান ১৭৭তম। দেশটির পেছনে রয়েছে কেবল চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরিত্রিয়া।

মার্চে যুদ্ধ এবং প্রায় পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার সময় সিপিজে জানিয়েছিল, ইরানে অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক কারাগারে ছিলেন।

কারাগারে থাকা সাংবাদিকদের শুধু আটক থাকার বিষয়টি নয়, তাঁদের কারাগারের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

ইরানি-মার্কিন সাংবাদিক রেজা ভালিজাদেহ তেহরানের এভিন কারাগারে বন্দী। জুনে সিবিএস নিউজের হাতে আসা একটি রেকর্ডিংয়ে তিনি বলেন, বন্দীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। ডেফি জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরে ভালিজাদেহকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগও দেওয়া হয়নি।

মার্কিন সরকার ভালিজাদেহকে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ডেফির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আপিলের পর তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

২০২৫ সালেও শত শত পদক্ষেপ

ইরানের গণমাধ্যমের ওপর চাপ অবশ্য এ বছরের বিক্ষোভ ও যুদ্ধের আগেই ছিল।ডেফির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অন্তত ২২৫ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিচারিক বা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওই বছর অন্তত ১৪৮টি নতুন মামলা বা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।

ডেফির হিসাবে, ২৫ জন সাংবাদিক বা গণমাধ্যম ব্যবস্থাপককে মোট ৩০ বছরের বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আটটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অথবা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অধিকার লঙ্ঘনের অন্তত ৩৯৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হয়রানি, নির্বিচারে আটক, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দেওয়া এবং সাংবাদিকদের পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগের মতো ঘটনাও রয়েছে।

সাংবাদিক দিবসে ইরানের এই চিত্র স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারাগারে থাকা সাংবাদিক, দীর্ঘমেয়াদি সাজা এবং সংবাদ সংগ্রহের ওপর বিধিনিষেধ-সব মিলিয়ে দেশটিতে স্বাধীন গণমাধ্যমের পরিসর আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অধিকারকর্মীরা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement