কর্ণফুলী টানেল: প্রত্যাশার তুলনায় যানবাহন কম, আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ছে
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেল চালুর প্রায় আড়াই বছর পরও প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিপুল বিনিয়োগের এই অবকাঠামো থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আয়ের আশা করেছিল, বাস্তবে তা অনেক কম হচ্ছে। উল্টো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় আর্থিক চাপ বাড়ছে।
যানবাহন চলাচল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম
২০২৩ সালের ২৯
অক্টোবর টানেল চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মোট ৯৪৫ দিনে কর্ণফুলী
টানেল ব্যবহার করেছে ৩৬ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৬টি যানবাহন। সে হিসাবে দৈনিক গড়ে চলাচল
করেছে মাত্র ৩ হাজার ৮৭৮টি যানবাহন।
অথচ প্রকল্পের
সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রথম বছরে প্রতিদিন গড়ে ১৭ হাজার ২৬০টি যানবাহন চলাচলের
পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা দৈনিক প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৮
হাজারে পৌঁছাবে বলেও ধারণা করা হয়েছিল। বাস্তবে বর্তমানে চলাচলকারী যানবাহনের
সংখ্যা সেই প্রত্যাশার তুলনায় প্রায় সাত গুণ কম।
রাজস্ব আয় হলেও বাড়ছে লোকসান
টানেল কর্তৃপক্ষের
তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত টোল থেকে সরকারের মোট
রাজস্ব আয় হয়েছে ১০৬ কোটি ১০ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে
প্রায় ১১ লাখ ২৩ হাজার টাকা।
কিন্তু টানেলের
দৈনিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ফলে প্রতিদিন
আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৬ লাখ টাকারও বেশি। বার্ষিক হিসাবে
পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা, যেখানে বর্তমান আয় কাঠামো অনুযায়ী প্রতি
বছর প্রায় ৯৮ থেকে ১০০ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
কর্ণফুলী টানেলের
ব্যবস্থাপক বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক প্রায় ১৯ হাজার ৬৬৯
থেকে ২৮ হাজার যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস ছিল। বর্তমানে গড়ে তিন হাজার থেকে সাড়ে
চার হাজার যানবাহন টানেল ব্যবহার করছে।
ঈদের ছুটিতেও বাড়েনি উল্লেখযোগ্যভাবে যানবাহন
ঈদুল আজহা উপলক্ষে
দীর্ঘ সরকারি ছুটিতেও টানেলে প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল দেখা যায়নি। বাংলাদেশ সেতু
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনে টানেল ব্যবহার করেছে
৩১ হাজার ৮৮৯টি যানবাহন। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে চলেছে ৪ হাজার ৫৫৫টি যানবাহন।
একই সময়ে টোল বাবদ
আয় হয়েছে ৯৫ লাখ ৮০ হাজার ৪৫০ টাকা, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
কেন বাড়ছে না যানবাহন চলাচল?
পরিবহন ও অবকাঠামো
বিশেষজ্ঞদের মতে, টানেলকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল এবং পর্যটননগরী
কক্সবাজারমুখী এলাকায় যে শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠার কথা ছিল,
তার অনেকগুলোই এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে টানেলের ওপর প্রত্যাশিত
পরিবহন চাপ তৈরি হয়নি।
তাদের মতে,
টানেলের দুই প্রান্তে শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক হাব, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও নতুন বাণিজ্যিক
কেন্দ্র গড়ে না উঠলে যানবাহন চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনাও সীমিত থাকবে।
নির্মাণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
কর্ণফুলী টানেল
প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও নানা মহলে আলোচনা রয়েছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটির
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। শুরুতে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি
টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭০
কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে।
আন্তর্জাতিক
বিভিন্ন টানেল প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, কর্ণফুলী টানেলের প্রতি
কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের
আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত করতে হলে টানেলকে ঘিরে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম
দ্রুত বাস্তবায়ন এবং যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্ভাবনা ও বাস্তবতার ব্যবধান