অনুপস্থিত খামেনির অদৃশ্য ক্ষমতার অদ্ভুত প্রভাব

 প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৬ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

অনুপস্থিত খামেনির অদৃশ্য ক্ষমতার অদ্ভুত প্রভাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে জনসমক্ষে অনুপস্থিত। তাঁর এই অনুপস্থিতি তেহরানে ক্ষমতা প্রয়োগের এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। লিখিত বার্তা তাঁর নামে প্রকাশিত হচ্ছে, কর্মকর্তারা সেসব বার্তার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন; কিন্তু সিদ্ধান্তের দায় যেন ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে।

খামেনিকে জনসমক্ষে না দেখা যাওয়ায় তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁর ইচ্ছার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আর যাঁদের হাতে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিক ক্ষমতা বেশি, তাঁরাই নিজেদের ব্যাখ্যাকে নীতিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অনেক অনুষ্ঠানেই খামেনিকে দেখা যায়নি। এমনকি তাঁর স্ত্রীর জানাজা এবং তাঁর বাবা ও পূর্বসূরি আলী খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে বড় আকারের অনুষ্ঠানেও তাঁর উপস্থিতি ছিল না।

তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়েও পরস্পরবিরোধী নানা দাবি ছড়িয়েছে। কেউ বলছেন তিনি সুস্থ আছেন, আবার কেউ তাঁর আহত হওয়ার এমনকি শরীরের কোনো অঙ্গ হারানোর দাবিও করেছেন। ক্ষমতাসীন মহলের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য তাঁর ছবি বা কণ্ঠ প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থার কথা বলেছে।

‘নীতিগতভাবে’ ভিন্নমত

নিরাপত্তার কারণ যা-ই হোক, ইরানিদের কাছে নতুন সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক অবস্থা, সক্ষমতা বা মতামত নিজেরা যাচাই করার সুযোগ খুবই সীমিত। তাঁকে তারা মূলত লিখিত বার্তা এবং কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যার মাধ্যমে জানতে পারছেন।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনা এবং সমঝোতা স্মারক নিয়ে খামেনির নামে প্রকাশিত একটি বার্তা।

ওই বার্তায় প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে আলোচনার দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় এবং কার্যত সমঝোতা স্বাক্ষরের অনুমতিও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, ‘নীতিগতভাবে’ তাঁর অবস্থান ছিল ভিন্ন।

এই দুটি শব্দই দ্রুত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে ওঠে।

আইআরজিসির রাজনৈতিক শাখার উপপ্রধান দাবি করেন, এর অর্থ খামেনি মূলত আলোচনার বিরোধী ছিলেন-এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়। তাঁর ভাষায়, এই ব্যাখ্যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কিন্তু খামেনির এক সামরিক উপদেষ্টা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, নেতা যখন বলেন ‘নীতিগতভাবে আমার মত ভিন্ন ছিল’, তখন এর অর্থ হলো তাঁর নিজের পরিকল্পনাই সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নেওয়া পথের চেয়ে ভালো ছিল।

একই বার্তাকে তাই কূটনীতির অনুমোদন হিসেবেও তুলে ধরা যাচ্ছে, আবার আলোচনার বিষয়ে খামেনির আপত্তির প্রমাণ হিসেবেও উপস্থাপন করা যাচ্ছে। তাঁর ঘনিষ্ঠতার দাবি করা ব্যক্তিরাই কার্যত তাঁর হয়ে কথা বলছেন।

যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে খামেনির ভাবমূর্তি

একই প্রক্রিয়ায় খামেনিকে একজন যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে।আইআরজিসির কমান্ডারের উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাব্বারি খামেনির সামরিক বিষয়ে ‘কমান্ড ও দক্ষতা’ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক পরিচালনার কথা বলেছেন।

তাঁর সমর্থকেরা ‘খামেনি আবার তরুণ হয়েছেন’-এমন স্লোগানও প্রচার করছেন। এর মাধ্যমে যুদ্ধের সময় নেতৃত্বের পরিবর্তনকে নতুন উদ্যমের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

ফলে সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো শুধু সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে না; একই সঙ্গে জনগণের সামনে তাঁর চরিত্র, সক্ষমতা ও উদ্দেশ্যও ব্যাখ্যা করছে।

বিদেশি নেতারাও অনিচ্ছাকৃতভাবে তাঁর এই অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে বলেছেন, খামেনি জীবিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনায় খামেনি ‘নিশ্চিতভাবেই, শতভাগ’ যুক্ত আছেন। এমনকি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন ট্রাম্প।

ফলে একদিকে খামেনির অধীনস্থরা তাঁকে সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও ইরানের শত্রুদের মোকাবিলা করা নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে তাঁর বিরোধীরাও তাঁকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে বিবেচনা করছেন। অথচ তিনি নিজে জনসমক্ষে অনুপস্থিত।

তাহলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে?

ইরান যখন সংঘাত চালিয়ে যাওয়া নাকি কূটনীতির পথে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি, তখন খামেনির অনুপস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

তিনি আলোচনার অনুমতি দিয়েছেন এবং একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পথও খুলে দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার তাঁর নামে প্রকাশিত বার্তায় প্রতিশোধের কথাও বলা হয়েছে। ফলে ভিন্ন অবস্থানের কর্মকর্তারাও দাবি করতে পারছেন, তাঁরা একই নেতার ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করছেন।

যুদ্ধের সময়ে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে রয়েছে সংগঠিতভাবে কাজ করার ক্ষমতা। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গণমাধ্যম কাঠামোতেও তাদের বিস্তৃত উপস্থিতি রয়েছে।

খামেনির ইচ্ছা যখন স্পষ্ট নয়, তখন সমঝোতার পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যাখ্যাকে নীতিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।

আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর কমান্ডার মাজিদ মুসাভিও অন্যদের সর্বোচ্চ নেতার ইচ্ছা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বাহিনী বর্তমান যুদ্ধে বড় ধরনের দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু সেই ইচ্ছা আসলে কী-তা-ই এখন পরিষ্কার নয়।

ফলে নীতি নির্ধারিত হচ্ছে লিখিত বার্তা, পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা এবং সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বের বারবার উল্লেখের মধ্য দিয়ে। কোনো সাফল্যের কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে তাঁর নেতৃত্বকে; আবার ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত ও তার পরিণতির দায় ছড়িয়ে পড়ছে বৃহত্তর একটি ক্ষমতাকাঠামোর ওপর।

মোজতবা খামেনিকে ইরানিরা যত কম দেখছেন ও শুনছেন, তাঁর চিন্তা ও ইচ্ছা সম্পর্কে জানতে তত বেশি অন্যদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর ইরান যখন যুদ্ধ ও কূটনীতির মধ্যে পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন প্রশ্নটি শুধু সর্বোচ্চ নেতা কী চান-তা নয়; তাঁর ইচ্ছার অর্থ নির্ধারণ করার ক্ষমতা আসলে কার হাতে, সেটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement