কলম্বিয়ায় শতাব্দীর শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ১১১

 প্রকাশ: ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১১ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

কলম্বিয়ায় শতাব্দীর শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ১১১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮৭ জন। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। সোমবার আঘাত হানা ভূমিকম্পটিকে দেশটির চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে জানিয়েছে কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা।

পশ্চিম কলম্বিয়ার কালি, পেরেইরা, কুইবদো ও মানিজালেসসহ বিভিন্ন শহরে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও পানামাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার এলাকায়। রাজধানী বোগোতা থেকে এলাকাটি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১০৭ কিলোমিটার।

ভূমিকম্পের পর কয়েক ঘণ্টায় অন্তত ২১টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।

দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারাও হাত লাগিয়েছেন। কর্মকর্তাদের হিসাবে, শহরটিতে অন্তত ২০টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং ৩৮০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ভবনে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপ থেকে কংক্রিটের বড় টুকরো সরাতে স্বেচ্ছাসেবকেরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করেন। ৬৪ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক হোর্হে মনকায়ো বলেন, শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধুলোর মেঘ উঠতে দেখেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমার পুরো বাড়ি কেঁপে উঠেছিল। এত শক্তিশালী ভূমিকম্প আমি কখনো দেখিনি।’

কালির একটি ধসে পড়া ভবনের কাছে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া হুয়ান কার্লোস ওসোরিও স্থানীয় টেলিভিশনকে বলেন, ভবনটি ধসে পড়ার শব্দ ‘বোমা বিস্ফোরণের মতো’ শোনায়। আটকে পড়াদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে কলম্বিয়া সরকার। নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করাই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জীবন রক্ষা, ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রের সব সক্ষমতা কাজে লাগানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রিসারালদা অঞ্চলে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। কফি উৎপাদনকারী এই অঞ্চলের রাজধানী পেরেইরায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধসে পড়া ভবনগুলোতে উদ্ধারকর্মীরা এখনো জীবিতদের সন্ধান করছেন।

কালি অবস্থিত ভায়েয় দেল কাউকা অঞ্চলে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছের চোকো অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতে সময় লাগছে। অঞ্চলটির গভর্নর জানিয়েছেন, সেখানে ১২ জন নিহত ও ৮৪ জন আহত হয়েছেন।

চোকোর রাজধানী কুইবদোর এক স্থানীয় নেতা লুইস গ্রেগোরিও মোরেনো বলেন, সেখানে বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা হতাহতদের পাশাপাশি নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

সোমবার বিকেল নাগাদ নিখোঁজ স্বজনদের তথ্য অনলাইনে নথিভুক্ত করতে শুরু করেন স্বজনেরা। একটি ডিজিটাল তালিকাতেই ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের নাম উঠে আসে; তাদের বেশির ভাগই কালি ও পেরেইরার বাসিন্দা

পেরেইরা বিমানবন্দরের ছাদ থেকে ধ্বংসাবশেষ খসে পড়ার ছবি ও ভিডিও স্থানীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত যাত্রীরা তখন নিরাপদ জায়গা খুঁজে আশ্রয় নিচ্ছিলেন। শহরটির মেয়র জানান, অন্তত ১৫টি ভবন ধসে পড়েছে এবং সেগুলোর ভেতরে মানুষ আটকা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পার্শ্ববর্তী মানিজালেসে শহরের ঐতিহাসিক নিও-গথিক ক্যাথেড্রালের একটি পাশের টাওয়ার ধসে পড়ে। এর ধ্বংসাবশেষ আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।

পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে কলম্বিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আর্মেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেন্তুরা বিমানবন্দরে প্রকৌশলীরা ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করছেন।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের অংশ হওয়ায় কলম্বিয়ায় ছোট মাত্রার ভূমিকম্প নিয়মিতই হয়। তবে ৬ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প সেখানে বিরল। ১৯৯৯ সালে আর্মেনিয়ার কাছে ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, সোমবারের ভূমিকম্পটি একবিংশ শতাব্দীতে দেশটিতে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।

নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সুজান ভ্যান ডার লি বলেন, ভূমিকম্পটির শক্তিশালী মাত্রা, স্থলভাগের অবস্থান এবং ভূত্বকের ভেতরের চাপ সরে যাওয়ার ধরন জনবসতিপূর্ণ উপত্যকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে থাকতে পারে। গভীরতা বেশি হওয়ায় সাধারণত কম ঝাঁকুনি হওয়ার কথা থাকলেও এত বড় মাত্রার কারণে এবার ব্যাপক কম্পন হয়েছে বলে তিনি জানান।

কলম্বিয়ার দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র সোমবার রাতে জরুরি আশ্রয়, খাবার ও ভূমিকম্প-পরবর্তী অন্যান্য সহায়তার জন্য ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম এবং চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তও কলম্বিয়াকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক, প্যারামেডিক, ত্রাণসামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে এল সালভাদর। ইসরায়েল, ইকুয়েডর ও ফ্রান্সও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement