রাশিয়ায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ১৩

 প্রকাশ: ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

রাশিয়ায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ১৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

রাশিয়ার নিজনেকামস্ক শহরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। হামলায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩৯ জন। সোমবারের এই হামলার পর রাশিয়ার তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রে শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে।

তাতারস্তানের আঞ্চলিক প্রধান রুস্তাম মিনিখানভ হামলাটিকে ‘বর্বরোচিত’ বলে নিন্দা করেছেন। টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, হামলায় বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রুশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলাটি চালানো হয়েছে মস্কো থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত নিজনেকামস্ক এলাকায়। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য ছিল ওই অঞ্চলের একটি তেল স্থাপনা।

তাতারস্তানের রাজধানী কাজানে উজবেক কনস্যুলেট জানিয়েছে, নিহত ১৩ জনের মধ্যে অন্তত সাতজন উজবেক নাগরিক। মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দেশ উজবেকিস্তানের প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ নাগরিক রাশিয়ায় কাজ করেন। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে উজবেকিস্তান কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ধরে রাখার পাশাপাশি ইউক্রেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থনের কথাও জানিয়েছে দেশটি।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতভর ইউক্রেনের ছোড়া ৪৫০টির বেশি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস বা প্রতিহত করা হয়েছে। দুই দেশই সাম্প্রতিক সময়ে একে অপরের ভূখণ্ডে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

নিজনেকামস্ক রাশিয়ার জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শহরটিতে দেশটির অন্যতম বড় ও আধুনিক তেল শোধনাগার রয়েছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, রাতের হামলায় ওই স্থাপনাটিতে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে।

রাশিয়ার তদন্ত কমিটির মুখপাত্র সভেতলানা পেত্রেঙ্কো জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে একটি শিশু রয়েছে। তাঁর দাবি, ইউক্রেন শিল্প ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যেসব স্থাপনার সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই।

হামলার ঘটনায় রাশিয়া একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। রুশ কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মস্কো থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাতারস্তানে হামলার পর এক দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। একই শিল্পাঞ্চলে চলতি বছরের জুন ও জুলাইয়েও কয়েক দফা হামলা হয়েছিল।

ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার ড্রোন হামলার লক্ষ্য রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করা—জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত করা, সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করা এবং দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করা। সোমবারের হামলাকে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সমন্বিত দীর্ঘপাল্লার হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ইউক্রেনের ড্রোন যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া মেজর রবার্ট ‘ম্যাগিয়ার’ ব্রোভদি বলেছেন, ক্রিমিয়ায় সাম্প্রতিক হামলা একটি বৃহত্তর অভিযানের প্রথম ধাপ। এর লক্ষ্য, রুশ বাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে ক্রিমিয়াকে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করা।

২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। ব্রোভদি এপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পূর্ণ সক্ষমতায় অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মাত্র ১৪ শতাংশ তার বাহিনীর হাতে রয়েছে। পশ্চিমা মিত্রদের প্রতিশ্রুত অর্থ দ্রুত পাওয়া গেলে তারা সাত গুণ বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম হবে বলে দাবি করেন তিনি।

ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের সাম্প্রতিক অভিযানে রেলসেতু, তেল মজুতকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলার উদ্দেশ্য রুশ বাহিনীর সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করা এবং ইউক্রেনের দিকে আসা ড্রোন শনাক্তে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা কমানো।

এদিকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে রুশ বাহিনীর ব্যাপক গোলাবর্ষণে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি আবাসিক এলাকায় এই হামলা চালানো হয়।

চুহুইভ জেলার একটি গ্রামে হামলার ঘটনায় সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক কৌঁসুলির কার্যালয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকবে এবং মস্কো এর প্রভাব ‘অনুভব করতে শুরু করেছে’। যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার অনীহার অভিযোগ তুলে শান্তি প্রচেষ্টা নিয়ে চলতি সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কথা বলার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

রাশিয়ার হামলার কারণে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির পূর্বাভাসও কমেছে। কৃষিমন্ত্রী তারাস ভিসোৎস্কি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ মৌসুমে দেশটির শস্য রপ্তানি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমে ৩ কোটি ৮০ লাখ থেকে ৪ কোটি টনে নেমে আসতে পারে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় ওদেসা বন্দরকেন্দ্রে রুশ হামলা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে শস্য পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ইউক্রেনের বৈশ্বিক শস্যবাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সমুদ্রবন্দর দিয়ে পরিবহন করা হয়। কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বন্দর অবরোধের কারণে কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।

সূত্র:আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement