সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি নিয়ে মামলা চলবে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আপিল আদালত শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তিকর নকশা তৈরির অভিযোগে মেটা, গুগল, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাটসহ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের করা হাজারো মামলা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক নবম ইউএস সার্কিট কোর্ট অব আপিলস সোমবার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আবেদন খারিজ করে বলেন, মামলাগুলো বন্ধ করার জন্য তাদের করা আপিলটি সময়ের আগেই করা হয়েছে। সাধারণত কোনো মামলা শেষ হয়ে রায় বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার পর আপিল করা যায়।
এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা শিশু ও কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর এবং আসক্তিকর করে তোলার অভিযোগে দায়ের করা ৩ হাজারের বেশি মামলা আপাতত এগিয়ে যাবে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যুক্তি দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিকেশনস ডিসেন্সি অ্যাক্টের ২৩০ নম্বর ধারা তাদের সুরক্ষা দেয়। এই ধারা সাধারণত ব্যবহারকারীদের তৈরি ও প্রকাশ করা কনটেন্টের দায় থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে সুরক্ষা দেয়।
কোম্পানিগুলোর দাবি ছিল, প্ল্যাটফর্মের আসক্তিকর নকশা সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক না করার অভিযোগ থেকেও তাদের এই আইনি সুরক্ষা পাওয়া উচিত।
তবে আদালত ভিন্ন মত দিয়েছেন। বিচারকেরা বলেছেন, ২৩০ নম্বর ধারা দায় থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়, কিন্তু মামলা করার বিরুদ্ধে কোনো সার্বিক দায়মুক্তি দেয় না। তাই মামলার এই পর্যায়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আপিল করার সুযোগ তৈরি হয়নি।
এদিকে ২৯টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের করা আরেক মামলার বিচার পিছিয়ে দেওয়ার মেটার আবেদনও আদালত নাকচ করেছেন। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, মেটা বেআইনিভাবে শিশুদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার করেছে এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের নকশা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
বুধবার থেকে ওই মামলার বিচার শুরুর কথা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও উদ্বেগ বাড়ছে। শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, বিশেষ করে আত্মহানি ও খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যার ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দেশে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ফ্রান্স আগামী মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। দেশটির উচ্চবিদ্যালয়গুলোতেও মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়াও শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যুক্তরাজ্য আগামী বছর একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তরুণদের সহিংস আচরণের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। অস্ট্রেলিয়ার ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পথ অনুসরণ করার ইচ্ছাও জানিয়েছেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার আইনে বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশ ঠেকাতে হবে। আইন না মানলে কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা দিতে হতে পারে।
যুক্তরাজ্যেও তরুণদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। মে মাসের শেষ দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ব্রিটিশ শিশু-কিশোরদের ওপর এর প্রভাব মোকাবিলায় ‘দৃঢ়’ পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সন্তানদের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা কয়েকটি পরিবারের সদস্য ও অধিকারকর্মীরা লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে বিক্ষোভ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলাগুলো করেছে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, স্থানীয় সরকার, স্কুল জেলা ও ভুক্তভোগী পরিবার। মামলাগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো জেনেশুনে এমন পণ্য ও সেবা তৈরি করেছে, যা শিশু-কিশোরদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করেছে এবং বিষণ্নতা, উদ্বেগসহ মানসিক স্বাস্থ্য সংকট বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
মামলাগুলো ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে জেলা বিচারক ইভন গনজালেস রজার্সের আদালতে একত্র করা হয়েছে। বাদীরা ক্ষতিপূরণ, জরিমানা ও অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, এ ধরনের মামলায় প্রথমবার বিচার পর্যন্ত গড়ানো একটি ঘটনায় লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি জুরি মেটা ও গুগলকে অবহেলার জন্য দায়ী করেছে। ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউব ব্যবহারে ছোটবেলায় আসক্ত হয়ে পড়ার দাবি করা ২০ বছর বয়সী এক তরুণীকে ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
নিউ মেক্সিকোর আরেক মামলায় মেটা দুই দফাতেই হেরেছে। প্রথমে একটি জুরি নিরাপত্তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবি করার অভিযোগে কোম্পানিটিকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে একজন বিচারক মেটার প্ল্যাটফর্মকে জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরির দায়ে আরও ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার জরিমানা করেন।
মেটা ও গুগল অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
সূত্র:আলজাজিরা