জাতীয় ঈদগাহে ঈদুল আজহার প্রধান জামাত: ফিলিস্তিন ও ইরানের নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য বিশেষ মোনাজাত, উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী

 প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১০:২৪ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

জাতীয় ঈদগাহে ঈদুল আজহার প্রধান জামাত: ফিলিস্তিন ও ইরানের নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য বিশেষ মোনাজাত, উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী

প্রতিবেদক, ঢাকা: 

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাত আজ রাজধানী ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট-সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃষ্টির শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সকাল থেকেই রাজধানীর নানা প্রান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ঢল নামে ঈদগাহ ময়দানে। তীব্র গরম আর নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় হাজার হাজার মানুষ একই সমান্তরালে শামিল হন। এবারের ঈদের জামাতে চিরাচরিত উৎসবের আমেজের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছিল এক গভীর মানবিক ও বৈশ্বিক বেদনা। নামাজ শেষে মোনাজাতে বিশ্বশান্তি কামনার পাশাপাশি বিশেষভাবে ফিলিস্তিন ও ইরানের নির্যাতিত মুসলমানদের মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা করা হয়। একই সাথে সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারি হামের ভাইরাসে আক্রান্তদের আরোগ্য এবং মৃতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

বৃহস্পতিবারের এই বিশেষ সকালে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতি ও খুতবা পাঠ করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা আবদুল মালেক। নামাজের পর প্রদত্ত তাৎপর্যপূর্ণ খুতবায় তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা তুলে ধরেন। খতিব সাহেব কেবল লোকদেখানো পশুবলি না দিয়ে, মানুষের ভেতরের অহংকার, হিংসা, লোভ ও ‘মনের পশুকে জবাই’ করার জোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ত্যাগের মানসিকতা ছাড়া কোরবানি কখনো কবুল হয় না। দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনায় তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন। খুতবা শেষে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যখন খতিব মোনাজাত শুরু করেন। দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে আমিন আমিন ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা ঈদগাহ ময়দান। মোনাজাতে উপস্থিত সর্বস্তরের মুসল্লিরা নিজেদের গুনাহ মাফ, মৃত ব্যক্তিদের কবরের আজাব থেকে মুক্তি এবং দেশ ও জাতির সুখ, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন।

এবারের ঈদের প্রধান জামাতটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবেও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জামাতে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের শীর্ষ এই দুই ব্যক্তিত্ব সাধারণ মানুষের সাথে একই কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন, যা ঈদগাহে এক অনন্য সম্প্রীতির আবহ তৈরি করে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও জামাতে শরিক হন জাতীয় সংসদের স্পিকার, দেশের প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যবৃন্দ, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এবং দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ। এছাড়া মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রকাশ করতে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরাও এই জামাতে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সবার সাথে ঈদের শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন।

জাতীয় ঈদগাহ ময়দানকে কেন্দ্র করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। এবার ঈদগাহের মোট ১২১টি কাতারে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির একসাথে নামাজ আদায় করার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা করা হয়। এর মধ্যে সমাজের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিআইপি) জন্য রাখা হয়েছিল সম্পূর্ণ আলাদা কাতার ও বিশেষ নিরাপত্তা বলয়, যেখানে প্রায় ২৫০ জন পুরুষ এবং ৮০ জন নারীর নামাজ আদায়ের নিখুঁত ব্যবস্থা ছিল। অন্যদিকে সাধারণ মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রায় ৩১ হাজার পুরুষ ও তিন হাজার ৫০০ নারীর বসার জন্য বিশাল প্যান্ডেল ও আধুনিক সামিয়ানা টাঙানো হয়। গরমের কথা চিন্তা করে পুরো ময়দানে পর্যাপ্ত ফ্যান, ওয়াটার কুলার ও আধুনিক ওজুখানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যা আগত মুসল্লিদের দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি অনেকটাই লাঘব করে।

আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটিয়ে এবারের ঈদ জামাতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পর্দা রক্ষা করে নারীরা যাতে অত্যন্ত পবিত্রতা ও নিরাপত্তার সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন, সেজন্য ঈদগাহে রাখা হয়েছিল সম্পূর্ণ পৃথক প্রবেশপথ। নারীদের জন্য নির্ধারিত জোনে ওজুখানা থেকে শুরু করে নামাজের স্থানটি ছিল সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে এবং সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। ফলে বিপুলসংখ্যক নারী মুসল্লি কোনো ধরনের হেনস্তা বা ভোগান্তি ছাড়াই নামাজ ও দীর্ঘ মোনাজাতে অংশ নিতে পেরে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। নামাজ শেষে মাঠ থেকে বের হওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুপরিকল্পিত ট্রাফিক ও ক্রাউড ম্যানেজমেন্টের কারণে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি। সার্বিকভাবে, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, বৈশ্বিক মানবতার প্রতি সহমর্মিতা এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার এক অপূর্ব সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এই বছরের ঈদুল আজহার প্রধান জামাত।                                                                                    সূত্র : ইউএনবি

Advertisement
Advertisement
Advertisement