ইরাকের যুদ্ধক্ষেত্রের আগুন নেভাল এক রেমিট্যান্সযোদ্ধার জীবনপ্রদীপ: লাশ হয়ে দেশে ফিরলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রাবন
অনলাইন ডেস্ক:
পারিবারিক সচ্ছলতা আর সোনায় মোড়ানো এক সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন চোখে চেপে প্রায় এক দশক আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকে পাড়ি জমিয়েছিলেন মুন্সিগঞ্জের তরুণ মোহাম্মদ শ্রাবন। তপ্ত মরুভূমির বুকে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে প্রতি মাসে দেশে যে রেমিট্যান্স পাঠাতেন, তা দিয়ে হয়তো ফিরতে শুরু করেছিল পরিবারের মুখে হাসি। কিন্তু বাগদাদের আকাশে হঠাৎ ধেয়ে আসা যুদ্ধের একটি নির্মম মিসাইল এক পলকেই গুঁড়িয়ে দিল একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, কেড়ে নিল এক রেমিট্যান্সযোদ্ধার তাজা প্রাণ।
সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ শুক্রবার (২৯ মে) ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশে ফিরেছেন শ্রাবন, তবে জীবন্ত কোনো মানুষ হিসেবে নয়, এক নিথর কফিনবন্দি লাশ হয়ে। ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে তার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তাঁর মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে তখন এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ইসলাম ওবায়েদ। কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিমন্ত্রী নিহতের প্রতি গভীর শোক ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং সেখানে উপস্থিত নিহতের স্তব্ধ, শোকার্ত স্বজনদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা জানান। সরকারের পক্ষ থেকে দাফন-কাফনের প্রাথমিক খরচের তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে পরিবারের হাতে ৩৫ হাজার টাকার একটি অনুদান তুলে দেওয়া হয়।
নিহত মোহাম্মদ শ্রাবন মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বকুলতলা গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ নলি মিয়ার ছেলে। প্রায় দশ বছর আগে ভাগ্য অন্বেষণে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যান তিনি। সেখানে একটি সাধারণ সংস্থায় কর্মরত অবস্থায় সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সংঘাতের কবলে পড়েন তিনি। এক অতর্কিত মিসাইল হামলায় কর্মস্থলেই প্রাণ হারান এই রেমিট্যান্সযোদ্ধা। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে বাগদাদের বাংলাদেশ দূতাবাসে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং দ্রুততম সময়ে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাগদাদ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, মরদেহের আইনি ও কনস্যুলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দূতাবাসের কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করেছেন। গত ২৫ মে বাগদাদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) পারভেজ আলম চৌধুরী দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেন। এরপর ২৭ মে বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তার্কিশ এয়ারলাইন্সের ‘টিকে-০৮৪৩’ ফ্লাইটে মরদেহটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তুরস্কে দীর্ঘ ট্রানজিটের জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে শুক্রবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায় শ্রাবনের নিথর দেহ।
এদিকে শ্রাবনের মৃত্যুর খবর মুন্সিগঞ্জের বকুলতলা গ্রামে পৌঁছানোর পর থেকেই পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে। গ্রামের বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার রোল। স্বজনরা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, যে ছেলে পরিবারের হাল ধরতে প্রবাসে গেল, সে আজ খাটিয়ায় চড়ে বাড়ি ফিরছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই নির্মম ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলছেন, দেশের অর্থনীতি সচল রাখা এই রেমিট্যান্সযোদ্ধার পরিবারের পাশে রাষ্ট্রের আরও বড় পরিসরে দাঁড়ানো উচিত। তাঁরা নিহত শ্রাবনের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং স্থায়ী সরকারি সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে এই অসহায় পরিবারটি অন্তত আর্থিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়।