শেষ দৃশ্যের পরেও থেকে যায় যার মহাজাগতিক ছায়া
প্রতিবেদক, ঢাকা:
বাংলাদেশের অভিনয় জগতের মানচিত্র যদি কোনো একজন মানুষের অবয়বে আঁকতে হয়, তবে সেখানে সবচেয়ে প্রগাঢ় এবং রহস্যময় নামটি নিশ্চিতভাবেই হুমায়ুন ফরীদি। তিনি কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন অভিনয়ের ব্যাকরণ ও ধারাকে ওলটপালট করে দেওয়া এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, এক মহাজাগতিক ফেনোমেনা। আজ ২৯ মে, এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিনে তাকে স্মরণ করতে গিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—কী এমন জাদু ছিল তার অভিনয়ে, যা আজও দর্শককে আচ্ছন্ন করে রাখে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, ফরীদি কোনো চরিত্রের খোলসে নিজেকে বন্দি করতেন না, বরং চরিত্রকেই নিজের ভেতরে এমনভাবে শুষে নিতেন যে, একসময় চরিত্র আর ব্যক্তি ফরীদি মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতেন। তাকে খলনায়ক বা প্রতিনায়ক—কোনো একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা আধুনিক অভিনয় সমালোচনার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কারণ, তিনি সব ধরনের সংজ্ঞার সমান্তরাল সীমানা পেরিয়ে নিজস্ব এক আকাশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে শেষ দৃশ্যের পরেও তার অনুভূতি থেকে যায় বহাল তবিয়তে।
হুমায়ুন ফরীদির অভিনয়ের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং শক্তিশালী দিক ছিল পর্দায় তার উপস্থিতির আগেই তৈরি হওয়া এক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। অনেক সময় দেখা যেত, তিনি কোনো দৃশ্যে প্রবেশ করার আগেই দর্শক যেন অবচেতনেই একটু থমকে গেছে। প্রেক্ষাগৃহ কিংবা ড্রয়িংরুমের দর্শক আগে থেকেই টের পেত যে এবার স্ক্রিনে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এক গভীর, জমাটবদ্ধ অনিশ্চয়তা তার অভিনয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠত। তিনি পর্দায় আসতেন অত্যন্ত ধীরলয়ে, কোনো তাড়াহুড়ো বা বাড়তি আতিশয্য ছাড়াই। কিন্তু সেই ধীরতার মধ্যে কোনো দুর্বলতা বা জড়তা ছিল না, বরং তা ছিল দৃশ্যপটের ওপর এমন এক একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, যেন পুরো গল্পটাই তার চরণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। তার চোখের চাহনি ছিল এক অদ্ভুত মায়াজাল ও আতঙ্কের মেলবন্ধন। চোখের দিকে তাকালে বোঝা যেত তিনি কীভাবে অবলীলায় মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলছেন। সেখানে কোনো উচ্চকিত প্রকাশ বা সস্তা সংকেত ছিল না, অথচ দর্শক ঠিকই বুঝে যেত যে এই শান্ত চোখের আড়ালে কোনো এক ভয়ঙ্কর ঝড় কিংবা গভীর হাহাকার লুকানো আছে। তিনি কখনো পর্দায় চিৎকার করে ভয় দেখাতেন না, কিন্তু এক অমোঘ ভয়ের আবহ তৈরি হয়ে যেত চারিপাশে। রাগ উগরে না দিয়েও তিনি তৈরি করতে পারতেন তীব্র ক্ষোভের পরিমণ্ডল। শব্দ উচ্চারণের আগেই চোখের মণি ও মুখের সূক্ষ্মতম পেশির কম্পনে অনুভূতিকে মূর্ত করে তোলার এই বিরল ক্ষমতায় তিনি অনন্য ও অতুলনীয় ছিলেন।
বাংলাদেশের রূপালি পর্দায় ভিলেন বা খল চরিত্রের আগমন ঘটেছে বহুবার এবং তাদের অনেকেই দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। তবে তাদের বেশিরভাগেরই আচরণ, সংলাপ প্রক্ষেপণ এবং উপস্থিতি ছিল অনেকটা রৈখিক ও অনুমানযোগ্য। দর্শকরা আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারতেন যে একটু পরেই এই চরিত্রটি কী করতে যাচ্ছে। হুমায়ুন ফরীদি বাংলা চলচ্চিত্রের এই চেনা ও ছকবাঁধা সমীকরণটিকে এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। তার অভিনীত চরিত্র কখন কী করবে, কোন মুহূর্তে কেমন আচরণ করবে, সেটার কোনো আগাম ধারণা পাওয়ার উপায় থাকত না। এই তীব্র রোমাঞ্চ এবং অনিশ্চয়তা তৈরির ক্ষমতাই তাকে সমসাময়িকদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রেখেছিল। তিনি চরিত্রকে কখনোই কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির থাকতে দিতেন না, বরং প্রতিটি মুহূর্তে তাকে নতুনভাবে ভাঙতেন এবং গড়তেন। আর এ কারণেই তার সামনে থাকা দর্শক কখনো একঘেয়েমিতে ভুগত না, বরং এক ধরণের মানসিক সতর্কতায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকত। এই অনিশ্চয়তার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল তার অভিনয়ের মূল শক্তি। তিনি মুখের সংলাপকে আগে থেকে মুখস্থ করা কোনো জড় বস্তু হিসেবে ব্যবহার করতেন না, বরং সংলাপকে সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তের আবেগ ও বাস্তবতায় জীবন্ত হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতেন। তার মুখ থেকে বের হওয়া অপ্রত্যাশিত বাচনভঙ্গি ও শব্দের মডুলেশন চরিত্রগুলোকে রক্ত-মাংসের মানুষের মতো বাস্তব করে তুলত। দর্শক দ্বিধায় পড়ে যেত যে এই মানুষটি পরের মুহূর্তে শান্ত থাকবে নাকি হঠাৎ করে হিংস্র পশুর মতো রূপ ধারণ করবে। এই দোলাচলই তার চরিত্রগুলোকে মানুষের মনের গহীনে স্থায়ী আসন করে দিয়েছিল।
তার অভিনয়শৈলীর আরেকটি যুগান্তকারী বৈশিষ্ট্য ছিল পরিমিতিবোধ ও সংযম। তিনি জানতেন অভিনয়ের মোক্ষম জায়গায় ঠিক কোথায় গিয়ে থামতে হয়। চড়া দাগের মেলোড্রামার যুগেও তিনি একটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কিংবা দীর্ঘ নীরবতা দিয়ে পুরো দৃশ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে অভিনেতার কাজ সব কিছু বলে দেওয়া নয়, বরং কিছু বিষয় দর্শকের হৃদয়ে অনুভব করানো এবং সেই শূন্যস্থানগুলো দর্শকের কল্পনা দিয়ে পূরণ করতে দেওয়া। তার অভিনীত চরিত্রগুলো কখনোই একমুখী বা সরল ছিল না; সেগুলো ছিল বহু স্তরের জটিলতায় ঢাকা এবং মানসিকভাবে ভাঙা। এই মানসিক ভাঙন দর্শককে চরিত্রটি থেকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে উল্টো এক ধরণের অদ্ভুত মায়ায় কাছে টেনে নিত। দর্শক অবচেতনভাবেই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হতো—একজন মানুষ কেন এমন হয়ে উঠল, কোন পরিস্থিতি তাকে এই অন্ধকারের মুখোমুখি এনে দাঁড় করালো? এই মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নগুলোই তার খল চরিত্রগুলোকে এক ধরণের ট্রাজিক নায়কের মর্যাদা এনে দিত।
চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে তার এই বহুমাত্রিকতার রূপ ছিল বিস্ময়কর। আশির দশকে সালাহউদ্দিন জাকির ‘দহন’ চলচ্চিত্রে তিনি যখন জীবনযুদ্ধে পিষ্ট, বেকার ও হতাশায় নিমজ্জিত এক যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন মধ্যবিত্তের চিরায়ত বাস্তবতার চাপ পর্দায় মূর্ত হয়ে ওঠে। আবার নব্বইয়ের দশকে শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’ চলচ্চিত্রে তিনি যখন এক কুখ্যাত অপরাধী ও রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন দর্শক ইতিহাসের অন্ধকারতম বিকৃতির মুখোমুখি হয়। ‘ত্যাগ’ চলচ্চিত্রে সাধুবেশধারী এক নির্মম খুনি হিসেবে তিনি দেখান কীভাবে মানুষের বাইরের পবিত্রতা আর ভেতরের হিংস্রতা পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। অন্যদিকে ‘ঘৃণা’ চলচ্চিত্রে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ, ঠান্ডা মাথার এক মাফিয়া রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সমাজ ও রাজনীতির কদর্য রূপকে চাবুক মেরেছিলেন। ‘বিশ্বপ্রেমিক’ ছবিতে তার অভিনীত সাইকোপ্যাথ চরিত্রটি তো বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই এক মাইলফলক, যেখানে একজন প্রেমিকের বিকৃত মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্মতম স্তরগুলো তিনি উন্মোচিত করেছিলেন। আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার ‘ভণ্ড’ চলচ্চিত্রে কমেডির আবহে অভিনয় করেও তিনি হাসির অন্তরালে এক অদ্ভুত অস্বস্তি ও অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রেখেছিলেন। এই চলচ্চিত্রগুলোর দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ফরীদি কখনো একই বৃত্তে ঘুরপাক খাননি, প্রতিটি চরিত্রকে তিনি নতুন তুলিতে এঁকেছেন।
টেলিভিশনের ছোট পর্দায় হুমায়ুন ফরীদির রাজত্ব ছিল আরও বেশি একচ্ছত্র। ইমদাদুল হক মিলনের রচনায় ও আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় ‘সংশপ্তক’ নাটকের সেই ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রটি আজও বাংলাদেশের নাট্য ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত চরিত্রগুলোর একটি। রমজানের ধূর্ততা, নির্মমতা এবং একই সাথে তার ভেতরের নিঃসঙ্গতার যে ভাঙন ফরীদি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। পরবর্তীতে ‘প্রেট’ নাটকে তার দ্বৈত ভূমিকা—একদিকে প্রাজ্ঞ অধ্যাপক এবং অন্যদিকে এক শয়তান উপাসকের রহস্যময় উপস্থিতি—তার অভিনয় ক্ষমতার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। আবার ‘বিষকাঁটা’ নাটকে প্রতিশোধের আগুনে পুড়তে থাকা এক বিপর্যস্ত মানুষের চরিত্রে তার প্রতিটি সংলাপের পেছনের অস্থিরতা দর্শককে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। শুধু নাটক বা সিনেমাই নয়, মঞ্চ নাটকেও তার পদচারণা ছিল সমান দাপুটে। ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’ বা ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’র মতো নাটকে মঞ্চ কাঁপানো ফরীদি সবসময়ই চরিত্রের গভীরতম ও অজানা স্তরগুলো খুঁড়ে বের করতে ভালোবাসতেন। তার এই নিরন্তর এক্সপেরিমেন্ট ও শরীরী ভাষা তাকে সাধারণ অভিনেতাদের কাতার থেকে আলাদা করে এক অনন্য উচ্চতায় বসিয়েছিল। তিনি শরীরকে সস্তা গিমিকের জন্য ব্যবহার না করে চরিত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার বানাতেন। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, হাঁটার গতি বা একটা সাধারণ হাত নাড়াও পুরো দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ডকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। এমনকি সহশিল্পীরাও তার সামনে দাঁড়ালে এক ধরণের ইতিবাচক চাপের মুখে পড়তেন এবং তাদের অভিনয়ের মানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হয়ে যেত।
হুমায়ুন ফরীদি তাই কেবল একটি নাম কিংবা একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন; তিনি বাংলা অভিনয় সংস্কৃতির এক সুবিশাল অধ্যায়, যাকে কেবল অনুভূতির চশমা দিয়েই পড়া সম্ভব, কোনো সুনির্দিষ্ট ফ্রেমে তাকে বন্দী করা অসম্ভব। আজ তার জন্মদিনে তাকে স্মরণ করার অর্থ হলো অভিনয়ের সেই চিরন্তন সততা ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, যা তিনি আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন। রূপালি পর্দার আলো নিভে যাওয়ার পর, প্রেক্ষাগৃহের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও যে মোহাবিষ্টতা দর্শকের মন জুড়ে থেকে যায়—তার নামই হুমায়ুন ফরীদি। তিনি শেষ দৃশ্যের পর বিদায় নেওয়া কোনো মানুষ নন, বরং তিনি সেই অবিনশ্বর অনুভূতি, যা সময়ের স্রোতকে জয় করে আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকবে।