ঈদের আনন্দ বিষাদে: সারাদেশে এক দিনে সড়কে ঝরল ২৬ প্রাণ
অনলাইন ডেস্ক:
ঈদের অনাবিল আনন্দ আর স্বজনদের সাথে মিলিত হওয়ার ব্যাকুলতা মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে চিরন্তন বিষাদে। উৎসবের আমেজকে স্তব্ধ করে দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেন বসেছিল এক নির্মম মৃত্যুর মিছিল। গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ফাঁকা সড়ক, বেপরোয়া গতি আর অসচেতনতার কারণে এই আনন্দঘন মুহূর্তেও দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক পথগুলো রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবারে ঈদের নতুন পোশাক আর হাসিমুখের জায়গা নিয়েছে স্বজন হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে গোপালগঞ্জে। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বেদগ্রাম স্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী বাস ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কোলারদোনিয়া গ্রামের সোহাগ তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী খাদিজা বেগম এবং ছয় বছরের ছোট ছেলে আহমদ আলীকে নিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। কিন্তু বাড়ি পৌঁছানোর আগেই বাসের ধাক্কায় ধূলিসাৎ হয়ে যায় পুরো পরিবারটি। এই একই দুর্ঘটনায় বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার শাওন ঢালী ও শোয়েব শেখ নামে আরও দুই তরুণ প্রাণ হারান। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে স্থানীয় প্রশাসন জানায়, এই সংঘর্ষে আরও অন্তত ২৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
একইভাবে ঈদের খুশি চোখের পলকে শোকে পরিণত হয়েছে পটুয়াখালীর গলাচিপায়। পৌরশহরের গ্রামীণ ব্যাংকের সামনের সড়কে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন মোহাম্মদ আল ফয়সাল ও তামিম ইকবাল নামের দুই সম্ভাবনাময় তরুণ। নিহত তামিম স্থানীয় মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন এবং আল ফয়সাল ঢাকার টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত মাদরাসার এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ঈদের দিনে দুই বন্ধুর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
শিশুদের কলকাকলিতে যে ঘর মুখরিত থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন চলছে মাতম। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে মায়ের সঙ্গে ঈদের দিন সকালে বাড়ি ফেরার পথে দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কের কানাগাড়ি বাজার এলাকায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় আব্দুল্লাহ ও আরিফা নামের চার বছরের দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় শিশুদের মা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যিনি হয়তো এখনও জানেন না তার কলিজার টুকরো দুটি আর বেঁচে নেই।
গাইবান্ধা জেলাতেও পৃথক দুর্ঘটনায় তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে মওলানা ভাসানী সেতুর উত্তরপ্রান্তে বেপরোয়া গতির একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় মালেকা বেগম নামের এক মধ্যবয়সী নারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। অন্যদিকে, বুধবার রাতে পলাশবাড়ীতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় পলাশবাড়ী সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক হাসান আলী প্রধান এবং রিকশাচালক সিদ্দিক আলী নামের আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি কেড়ে নিয়েছে নড়াইল ও টাঙ্গাইলের দুই তরুণের প্রাণ। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় ঢাকা-বেনাপোল মহাসড়কের আলমুন্সির মোড়ে বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে সাব্বির গাজী নামের এক মোটরসাইকেল চালক নিহত হন। অন্যদিকে টাঙ্গাইলের সখীপুরে সখীপুর-সাগরদিঘী সড়কের কচুয়া পুকুরপাড় মোড়ে দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে কানন নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলেই মারা যান। এছাড়া মাদারীপুরের শিবচরের ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পদ্মা সেতুসংলগ্ন এলাকায় চলন্ত বাস থেকে ছিটকে পড়ে সাত্তার হাওলাদার নামের এক ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
ফরিদপুর জেলাজুড়ে ঈদের আনন্দ পরিণত হয়েছে এক দুঃস্বপ্নে, যেখানে পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন। ভাঙ্গার চুমুরদি ইউনিয়নে বুধবার রাতে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে সাইফুল মোল্লা এবং আল ইমরান শরীফ নামের দুই চালক নিহত হন। এর পরদিনই, ঈদের বিকেলে পদ্মা সেতু দেখার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া দুই বন্ধু রাজন শেখ ও ইব্রাহিম ফকিরের মোটরসাইকেলের সাথে একটি প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। নারানখালী ব্রিজের পূর্ব পাশে ঘটা এই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই রাজন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইব্রাহিমের মৃত্যু হয়।
উৎসবের আমেজে নরসিংদী রেলস্টেশনে ঘটেছে এক অকল্পনীয় ট্র্যাজেডি। ঈদের নতুন জামা কিনে দেড় বছরের শিশু সাফওয়ান হাসেনকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মা সাথী বেগম। কিন্তু নরসিংদী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়েন তারা। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মা ও শিশু সন্তান উভয়কেই মৃত ঘোষণা করেন। নতুন জামা পরা আর হলো না ছোট্ট সাফওয়ানের, মায়ের কোলে করেই সে চলে গেল না ফেরার দেশে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকায় অতিরিক্ত গতির কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার রাতে ভেল্লাপাড়া ব্রিজসংলগ্ন তালতল ক্রসিং এলাকায় ঈগল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টো পথে যাওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি লেগুনার সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে লেগুনাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আরও অন্তত ২০ জন যাত্রী আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সবশেষে, বগুড়ার শেরপুর-ধুনট আঞ্চলিক সড়কেও ঈদের ফাঁকা রাস্তায় গতির উন্মাদনা কেড়ে নিয়েছে দুই শিক্ষার্থীর জীবন। শুভগাছা আকন্দপাড়া এলাকায় তিনটি মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র আবু রায়হান এবং শেরউড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র তামিম হোসেন নিহত হন। এই ঘটনায় তাদের আরও চার বন্ধু গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও হাইওয়ে পুলিশ প্রতিটি দুর্ঘটনাকবলিত যান জব্দ করেছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে সাধারণ মানুষের অভিমত, ঈদের সময় সড়ক ফাঁকা পেয়ে চালক ও তরুণদের গতি নিয়ন্ত্রণ না করা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণেই এবারের ঈদের দিনটি দেশের এতগুলো পরিবারের জন্য চিরকালের কান্না হয়ে রইল।