পশুর ছড়াছড়িতে ধস পশুর হাটে: ক্রেতার চেয়ে গরু বেশি, লোকসানের কান্নায় ভারী বাতাস

 প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১১:৩৬ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

পশুর ছড়াছড়িতে ধস পশুর হাটে: ক্রেতার চেয়ে গরু বেশি, লোকসানের কান্নায় ভারী বাতাস

প্রতিবেদক, ঢাকা:

ঈদের দিন বেলা তখন আনুমানিক একটা। চারপাশের বাতাসে তখনো কোরবানির মাংস কাটার ব্যস্ততা আর উৎসবের আমেজ। ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় কোরবানি সম্পন্ন হয়ে গেলেও কচুক্ষেত পশুর হাটের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তপ্ত রোদের মধ্যে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত শরীরে বসে ছিলেন কিশোরগঞ্জের মৌসুমি পশুর ব্যাপারী হাবিবুর রহমান। সামনে খুঁটিতে বাঁধা অবিক্রীত দুটি গরু। ঈদের আনন্দ তাকে স্পর্শ করেনি, তার চোখে-মুখে তখন শুধুই লোকসান কিছুটা হলেও কমানোর আকুল আকুতি।

বেলা দেড়টার দিকে মজিদুল ইসলাম নামের এক স্থানীয় ক্রেতা এসে হাবিবুরের একটি গরু ৮০ হাজার টাকায় কিনে নেন। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এই বাসিন্দা জানান, আগের রাতে এই গরুর দাম এক লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ৮০ হাজারের বেশি দিতে রাজি হননি। তখন বিক্রি না করলেও হাবিবুর নিজের ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিলেন, অন্য কোথাও পছন্দমতো গরু না পেলে যেন যোগাযোগ করেন। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত কোনো ক্রেতা না পেয়ে বাধ্য হয়ে হাবিবুর নিজেই মজিদুলকে ফোন করে গরুটা নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। পেশায় ভাসমান ফল বিক্রেতা হাবিবুর প্রায় ৪ লাখ টাকা ধারদেনা করে কিশোরগঞ্জ থেকে ৯টি গরু নিয়ে এসেছিলেন। অথচ মাত্র দুটি গরুতে সামান্য লাভ হলেও বাকিগুলোয় তাকে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হয়েছে। যে গরুটি তিনি আশি হাজারে বিক্রি করলেন, সেটির কেনা দামই ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা। পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার টাকারও বেশি।

বাস্তবে শুধু হাবিবুর নন, এবারের ঈদে ঢাকার পশুর হাটগুলোতে দেখা গেছে এক নজিরবিহীন ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য। গাবতলী থেকে শুরু করে কচুক্ষেত—সবখানেই ছিল গরুর উপচে পড়া ভিড়, কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতা ছিল একেবারেই কম। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল প্রায় ১ কোটি ১ লাখ, যার বিপরীতে পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি। এই বিশাল উদ্বৃত্তের কারণেই মূলত হাটে পশুর ছড়াছড়ি তৈরি হয়। ব্যাপারীরা জানান, হাটের এই অবস্থা দেখে অনেক চতুর ক্রেতা ঈদের আগের দিন গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে শুরুতে যে গরুর দাম ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছিল, গভীর রাতে তা আচমকা ৪০-৫০ হাজার টাকায় নেমে আসে। এক রাতের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকার বাজার ধসে পড়ে। হাটের এক কোণে দাঁড়িয়ে এক ব্যাপারী আক্ষেপ করে বলছিলেন, এবারের হাটে সারা রাত মানুষ কেঁদেছে। অবিক্রীত গরুগুলো যে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন, সেই ভাড়ার টাকাটুকুও অনেকের পকেটে অবশিষ্ট ছিল না।

এই দরপতনের পেছনে যেমন ছিল চাহিদার ভুল হিসাব, তেমনই ছিল ব্যাপারীদের অতিরিক্ত লাভের আশায় সঠিক সময়ে পশু বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত। কেরানীগঞ্জ থেকে আসা এক ব্যাপারী দুই মাস আগে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছিলেন। হাটে সেটির দাম ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠলেও ১ লাখ ৪০ হাজারের আশায় তিনি তা বিক্রি করেননি। শেষ মুহূর্তে দর পড়ে যাওয়ায় তাকে বিপুল লোকসান সইতে হয়েছে। তবে এই চরম বিপর্যয় ও দাম পড়ে যাওয়ার সুযোগটিকে ভিন্নভাবে কাজে লাগিয়েছেন কিছু চতুর কসাই, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কচুক্ষেত হাটের কাছেই ঈদের দিন সকাল থেকে প্রায় ৫০টি গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করতে দেখা গেছে।

মোহাম্মদ আসলাম নামের এক ব্যবসায়ী জানান, হাটে নিজের সাতটি গরু বিক্রি করে তার প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছিল। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিনি ঈদের দিন ভোরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দরে আরও পাঁচটি বড় গরু কিনে নেন। দুপুর নাগাদ সেগুলো জবাই করে প্রতি কেজি ৮০০ টাকা দরে মাংস বিক্রি করেন তিনি। তার হিসাব মতে, কেজিতে ১০০ টাকা লাভ করে তিনি লাইনের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, এই দরপতন ঢাকা শহরের অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের পাতে মাংসের জোগান দিয়েছে। কচুক্ষেত হাটে ৪৩ জন পিকআপ চালক ও সহকারী মিলে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকায় দুটি বড় গরু কেনেন। কসাই না পেয়ে নিজেরাই মাংস ভাগ করে নেন, যেখানে প্রত্যেকের ভাগে পড়ে প্রায় সাত কেজি করে মাংস। তাদের একজন মোহাম্মদ ইউসুফ আনন্দের সঙ্গে জানান, তাদের প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়েছে মাত্র ৭১০ টাকা, যা বাজারের স্বাভাবিক দামের চেয়ে অনেক কম। সামর্থ্য না থাকলেও গরুর দাম কমে যাওয়ার কারণে এবার তারাও দল বেঁধে ঈদের আনন্দ ও মাংসের স্বাদ উপভোগ করতে পেরেছেন। একপক্ষের চরম হাহাকার আর অন্যপক্ষের অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির মধ্য দিয়েই শেষ হলো এবারের কোরবানির পশুর হাট।

Advertisement
Advertisement
Advertisement