‘ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে’: ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঠাকুরগাঁও:
দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক খাতকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে টেনে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এককালের তীব্র রাজনৈতিক সংকটের পর দেশের শাসনভার গ্রহণ করা বর্তমান সরকারের যাত্রাপথকে একটি বিশাল ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে শুরুর সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, বিদায়ী শাসকগোষ্ঠী ও তাদের মন্ত্রীরা ব্যাংক খাতকে পুরোপুরি ফাঁকা করে দিয়েছে এবং প্রায় ৮০ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে। এমন একটি শূন্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন সরকার বিগত তিন মাসে দেশের সার্বিক উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় দেশের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শুক্রবার (২৯ মে) সকাল ১০টায় ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের তাঁতীপাড়ায় নবপ্রতিষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য (ভিসি) ড. ইসরাফিল শাহীনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোভাবেই মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। এর সুনাম ও অবস্থানকে সবসময় উচ্চে ধরে রাখতে হবে। উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নিশ্চিত করার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক তদবির বা অনৈতিক প্রভাব বরদাশত করা হবে না।
অনুষ্ঠানে এলজিআরডি মন্ত্রী দেশের সরকার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের পূর্বে তিনি ঠাকুরগাঁওবাসীকে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি পুরো বিশ্বের সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্পর্ক স্থাপনের একটি অন্যতম মাধ্যম। তাই একে বৈশ্বিক মানদণ্ড বজায় রেখেই পরিচালনা করতে হবে। অনুন্নত এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে এমন সুযোগ সবসময় আসে না উল্লেখ করে তিনি এলাকার তরুণ প্রজন্মকে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন, যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে অঞ্চলের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে সকাল ১১টায় মন্ত্রী জেলা শহরের কালীবাড়িতে অবস্থিত মির্জা রুহুল আমিন মিলনায়তনে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সেখানে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলার চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিগত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে দেশের ব্যাংকগুলো আজ দেউলিয়া প্রায়। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতা হাতে নিয়েছে যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ফেলতে হচ্ছে। ভাঙা অর্থনীতিকে জোড়া লাগিয়ে সচল করতে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মতবিনিময় সভার শেষ পর্যায়ে মির্জা ফখরুল বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রশংসা করেন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিক সাংবাদিকতার ধারা বজায় রাখার জন্য স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সরকার আগামী দিনগুলোতে গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর এবং সুযোগ ও সক্ষমতা অনুযায়ী স্থানীয় সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে। এই মতবিনিময় সভায় ঠাকুরগাঁও জেলায় কর্মরত বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যারা মন্ত্রীর কাছে এলাকার নানাবিধ সমস্যা ও সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেন।