ঘাম ঝরানো জয়ে সেমিফাইনালে বাংলার বাঘিনীরা, ১১ সেকেন্ডের অবিশ্বাস্য রেকর্ড
স্পোর্টস ডেস্ক:
দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে আরও একবার নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখল বাংলাদেশ। তবে গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের রোমাঞ্চকর ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষে এই জয়টি সহজে আসেনি। প্রথমার্ধের নাটকীয়তা আর দ্বিতীয়ার্ধের চরম উত্তেজনা পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানের দাপুটে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে মারিয়া মান্দার দল। এই জয়ের সুবাদে টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। মাঠের লড়াইয়ে কখনো দাপট, কখনো আবার রক্ষণভাগের অসতর্কতায় ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক চরম স্নায়ুযুদ্ধে, যা গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের নখ কামড়ানো মুহূর্ত উপহার দিয়েছে।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য হয়েছিল কোনো রূপকথার গল্পের মতো। রেফারির বাঁশি বাজার পর দর্শকরা ঠিকমতো আসনে বসার আগেই উল্লাসে মেতে ওঠে বাংলাদেশ শিবির। ঘড়ির কাঁটায় তখন মাত্র ১১ সেকেন্ড, যা দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম গোলের অবিশ্বাস্য এক কীর্তি। কিক-অফ থেকে বল পেয়েই মাঝমাঠের জেনারেল ও অধিনায়ক মারিয়া মান্দা নিখুঁত এক পাসে খুঁজে নেন গতিময় উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমাকে। উইং ধরে চোখের পলকে ডি-বক্সে নিখুঁত এক ক্রস বাড়ান ঋতুপর্ণা, আর সেখানে ওত পেতে থাকা সুইডেন প্রবাসী আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী দারুণ এক ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান। জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই এমন জাদুকরী গোল করে দেশের ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখলেন এই নবাগত ফরোয়ার্ড।
শুরুতেই এমন চোখধাঁধানো গোলের পর গ্যালারি ও ডাগআউটে ধারণা করা হচ্ছিল, আজ হয়তো মালদ্বীপকে গোলবন্যায় ভাসাবে বাংলাদেশ। কিন্তু ম্যাচের বাস্তব চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। প্রথম গোলের পর একের পর এক আক্রমণ করেও বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডরা গোলের দেখা পাচ্ছিলেন না। এর পেছনে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মালদ্বীপের গোলরক্ষক ফাতহিমাত সাওসান। বাংলার ফরোয়ার্ড লাইনের একের পর এক জোরালো শট বাজপাখির মতো রুখে দিয়ে তিনি যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে ম্যাচের ৩৪ মিনিটে আর শেষ রক্ষা হয়নি মালদ্বীপের। সানজিদা ও মারিয়াদের যৌথ আক্রমণের সুফল ধরে রেখে ডি-বক্সের ভেতর থেকে দারুণ এক শটে ব্যবধান ২-০ করেন উমেলাহ মারমা। দুই গোলে এগিয়ে গিয়ে যখন বাংলাদেশ বিরতিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘটে এক বিপর্যয়। প্রথমার্ধের শেষ দিকে রক্ষণভাগের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে দূরপাল্লার এক শটে গোল শোধ করে মালদ্বীপ। বাংলাদেশের গোলকিপার মিলি কিছুটা সামনে এগিয়ে থাকায় তার মাথার ওপর দিয়ে বল অলৌকিকভাবে জালে জড়ায়, যা পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেয়।
বিরতি থেকে ফিরে ব্যবধান বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ, কিন্তু মাঠের খেলায় দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। টুর্নামেন্টের অন্যতম আন্ডারডগ মালদ্বীপ যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিল। ম্যাচের অন্যতম ডিফেন্ডার আফিদার এক দুর্বল ড্রিবলিংয়ের সুযোগ নিয়ে বল কেড়ে নেন মালদ্বীপের ফরোয়ার্ড আমিনাত ফাজলা। গোলরক্ষককে একা পেয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সহজ প্লেসিংয়ে বল জালে জড়িয়ে ম্যাচটিকে ২-২ সমতায় ফেরান তিনি। সমতায় ফিরে মালদ্বীপ যখন রূপকথা গড়ার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখনই মারিয়া মান্দারা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। আক্রমণাত্মক ফুটবলের ধার বাড়িয়ে সমতা ফেরানোর ঠিক ছয় মিনিট পর আবার লিড নেয় বাংলাদেশ। এবার ভাগ্যও সহায় ছিল বাংলাদেশের; মালদ্বীপের এতক্ষণের ত্রাতা গোলরক্ষক সাওসান এক সহজ বল হাত ফস্কে ফেলে দিলে, চিতার মতো চটপটে স্বভাবের সুরভি আকন্দ প্রীতি ছুটে গিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন।
৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ দলের কোচ ডাগআউটে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগের মুহূর্তগুলোতে মালদ্বীপ সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালালেও বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা এবার আর কোনো ভুল করেননি। উল্টো ম্যাচের ইনজুরি সময়ে কর্নার পায় বাংলাদেশ। উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমার চমৎকার ও মাপা কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলে চোখধাঁধানো এক হেডে গোল করে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন কোহাতি কিসকু। রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই ৪-২ গোলের স্বস্তির জয় নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো দল। এর আগে সাফের মঞ্চে মালদ্বীপের বিপক্ষে তিনবারের দেখায় প্রতিবারই অনায়াস জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে এবারের লড়াইটি মারিয়া মান্দাদের মনে করিয়ে দিল যে, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে এখন আর কোনো দলকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ঘাম ঝরানো এই জয় নিশ্চিতভাবেই সেমিফাইনালের আগে বাংলাদেশ দলকে যেমন আত্মবিশ্বাসী করবে, তেমনি রক্ষণভাগের দুর্বলতাগুলো শুধরে নেওয়ার বড় বার্তাও দিয়ে গেল।