পটপরিবর্তনের পশ্চিমবঙ্গে ভিন্ন আবহেই কাটল কোরবানির ঈদ, কড়াকড়ি ও নস্টালজিয়ার দোলাচল
অনলাইন ডেস্ক:
বাঙালির রাজনৈতিক মানচিত্রে পরিবর্তনের পর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপিত হলো এক সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহে। দীর্ঘদিনের চেনা রীতিনীতি, উৎসবের চেনা কোলাহল আর রাজনৈতিক সমীকরণের খোলনলচে বদলে গিয়ে এবার রাজ্যজুড়ে প্রকাশ পেয়েছে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে যেমন ছিল কড়া আইনি কড়াকড়ি ও প্রশাসনের তীক্ষ্ণ নজরদারি, অন্যদিকে তেমনি ছিল উৎসবের চেনা ঐতিহ্য হারানোর এক চাপা নস্টালজিয়া। নতুন বিজেপি সরকারের কঠোর নীতি এবং কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক কিছু নির্দেশনার জেরে এবারের ঈদের চিরপরিচিত ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে।
শহরের কেন্দ্রবিন্দু রেড রোডের পরিবর্তে এবার কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছে কোরবানির ঈদের মূল জামাত। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল সাড়ে আটটায় নামাজ শুরু হওয়ার আগে থেকেই সেখানে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। তবে চেনা আঙিনা ছেড়ে নতুন জায়গায় আসার এই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই ছিল আবেগময়। ঝাড়খণ্ড থেকে ২৫ বছর আগে কলকাতায় আসা তালতলার বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল জানান, ২৫ বছর ধরে তিনি রেড রোডে নামাজ পড়ে আসছেন। এবার জায়গা বদলের খবর শুনে তার মন খারাপ হয়েছিল। শুধু সোহেলই নন, পার্ক স্ট্রিট, নিউমার্কেট কিংবা খিদিরপুরের বহু বাসিন্দা এবার ট্রাফিকের ঝামেলা এড়াতে কিংবা নতুন জায়গার অনিশ্চয়তার কারণে পাড়ার স্থানীয় মসজিদেই নামাজ আদায় করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই নামাজের আয়োজন করে আসা ‘ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি’র পক্ষে মোহাম্মদ খলিল জানান, মূলত ভারতীয় সেনাবাহিনীর আপত্তি এবং আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই পুলিশ এবার বিকল্প স্থান হিসেবে ব্রিগেডকে বেছে নেয়ার অনুরোধ জানায়। নতুন জায়গায় প্রথমবার আয়োজন হওয়ায় অন্য বছরের তুলনায় এবার লোকসমাগম কিছুটা কম ছিল।
রাজ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের প্রভাব কেবল নামাজের জায়গাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা প্রতিফলিত হয়েছে উৎসবের সামগ্রিক আমেজেও। বিগত তৃণমূল কংগ্রেস আমলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে যেভাবে ঈদের মঞ্চ থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দেখা যেত, এবার ব্রিগেডের মাঠে সেই চেনা রাজনৈতিক সমাগম সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। বর্তমান ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দুজনেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তা জানিয়েই নিজেদের দায়িত্ব সেরেছেন। অনুষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে রাখতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত অনুরোধ জানানো হচ্ছিল।
তবে এবারের ঈদের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কোরবানির পশুর হাটে। ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে বলবৎ করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এবার প্রকাশ্য স্থানে পশু জবাই এবং বয়স বা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত শংসাপত্র ছাড়া পশু বিক্রির ওপর জারি ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। এর ফলে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর পশুর হাটে বেচাকেনায় ব্যাপক মন্দা দেখা গেছে। আইনি জটিলতা ও পুলিশি হয়রানির ভয়ে বহু ব্যবসায়ী ও ক্রেতা এবার গরু কেনাবেচা থেকে বিরত ছিলেন। কলকাতা ও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে রাস্তা আটকে কোনো ধরনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান না করার যে কড়া নির্দেশিকা প্রশাসন জারি করেছিল, তার জেরে কোথাও রাস্তা আটকে নামাজ পড়তে দেখা যায়নি। এর প্রতিবাদে শহরের কিছু অংশে মৃদু বিক্ষোভ হলেও ঈদের দিন পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ থমথমে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজ্যজুড়ে যে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদর গড়ে তোলা হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের চোখে ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। কলকাতার বিখ্যাত টিপু সুলতান মসজিদ থেকে শুরু করে উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গ্রামীণ এলাকার মসজিদগুলোর বাইরেও বিপুল পরিমাণ রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) মোতায়েন ছিল। নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর জানান, ঈদের সকালে মসজিদের বাইরে অস্ত্রধারী কেন্দ্রীয় বাহিনী দাঁড়িয়ে থাকতে তারা আগে কখনো দেখেননি। রাস্তাঘাট ফাঁকা ও যানজটমুক্ত থাকলেও উৎসবের যে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, তা যেন কোথাও একটা নিয়মের বেড়াজালে আটকে গিয়েছিল।
এই উৎসবের আলোর নিচেই লুকিয়ে ছিল কিছু মানুষের ঘর হারানোর অন্ধকার। কলকাতার তপসিয়ার টালিখোলা মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি একটি বহুতলে অগ্নিকাণ্ডে দুই শ্রমিকের মৃত্যুর পর অবৈধ ভবন ভাঙার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। ঈদ আসার ঠিক আগেই উচ্ছেদ হওয়া সেই পরিবারগুলোর শূন্যতা গ্রাস করেছিল পুরো এলাকাকে। স্থানীয় আতর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জুনেইদ আফসোসের সুরে বলেন, যারা মাথার ছাদ হারিয়েছে, তাদের এই ঈদ কেমন কাটল তা কেউ জানে না। সব মিলিয়ে, আইন ও নিয়মের কড়াকড়িতে পশ্চিমবঙ্গের এবারের কোরবানি ঈদ শান্তি ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে শেষ হলেও, তা সাধারণ মানুষের মনে রেখে গেছে এক অদ্ভুত শূন্যতা ও মানিয়ে নেয়ার নতুন লড়াই।
সূত্র: বিবিসি বাংলা,কলকাতা পুলিশ ও ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি