মিরপুরের মহাকাব্য: নাহিদ রানার আগুনে পুড়ল পাকিস্তান, টাইগারদের হ্যাটট্রিক জয়
স্পোর্টস ডেস্ক:
মিরপুরের আকাশটা সকাল থেকেই যেন বাংলাদেশের জন্য এক বিশেষ বার্তা বয়ে আনছিল। হোম অব ক্রিকেটের বাইশ গজে তখন লড়াই আর জিদ মিলেমিশে একাকার। একদিকে সিরিজে লিড নেওয়ার হাতছানি, অন্যদিকে পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। দিনশেষে শেরে বাংলার সবুজ ঘাসে লেখা হলো এক সোনালি উপাখ্যান—পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়ে টানা তৃতীয় টেস্ট জয়ের আনন্দে ভাসল বাংলাদেশ।
গল্পের শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের দাপট দিয়ে। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর রাজকীয় সেঞ্চুরি আর মুমিনুল-মুশফিকের লড়াকু ফিফটিতে ৪১৩ রানের বিশাল সংগ্রহ পায় টাইগাররা। জবাবে পাকিস্তানও বুক চিতিয়ে লড়েছিল আজান আওয়াইসের শতকে, থামে ৩৮৬ রানে। মাত্র ২৭ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা বাংলাদেশ যখন ৯ উইকেটে ২৪০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করল, পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ালো ২৬৮।
মিরপুরের চতুর্থ ইনিংসের চিরাচরিত কঠিন সমীকরণ মাথায় নিয়ে ব্যাট করতে নামে পাকিস্তান। কিন্তু প্রথম ওভারেই শেরে বাংলার গ্যালারিকে উৎসবে মাতান তাসকিন আহমেদ। তার দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে কিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার ইমাম-উল হক। সেই যে শুরু, এরপর কেবলই যাওয়া-আসার মিছিল। দলীয় ৬৮ রানেই পাকিস্তান যখন ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে, তখন হাল ধরার চেষ্টা করেন আব্দুল্লাহ ফজল ও সালমান আগা। ৫১ রানের জুটিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বাধা হয়ে দাঁড়ান স্পিন জাদুকর তাইজুল ইসলাম। ৬৬ রান করা ফজলকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে পাকিস্তানের প্রতিরোধের দেওয়াল ভেঙে দেন তিনি। পরের ওভারেই সালমান আগাকে তুলে নিয়ে গ্যালারিতে গর্জন তোলেন তাসকিন।
কিন্তু ম্যাচের আসল নাটকীয়তা তখনও বাকি ছিল। ক্রিজে তখন পাকিস্তানের দুই বিশ্বস্ত ব্যাটার—মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সৌদ শাকিল। ঠিক তখনই বল হাতে জ্বলে উঠলেন তরুণ গতিদানব নাহিদ রানা। তার আগুনের গোলা আর এক্সপ্রেস গতির সামনে অসহায় হয়ে পড়লেন পাকিস্তানি ব্যাটাররা। নিজের টানা দুই ওভারে রিজওয়ান ও শাকিলকে ফিরিয়ে পাকিস্তানের জয়ের শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দিলেন রানা।
এরপর শুরু হলো নাহিদ রানার রেকর্ডগড়া স্পেল। একে একে পাকিস্তানের শেষ দিকের ব্যাটারদের শিকারে পরিণত করে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম ‘ফাইফার’ (৫ উইকেট) পূর্ণ করলেন তিনি। মাত্র ৪০ রান খরচ করে ৫ উইকেট নেওয়া রানার আগুনঝরা বোলিংয়ে ১৬৩ রানেই থমকে যায় পাকিস্তানের ইনিংস।
২৩ বছরের দীর্ঘ খরা কাটিয়ে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে তাদের হোয়াইটওয়াশ করার সেই রূপকথা যেন মিরপুরে নতুন পূর্ণতা পেল। রাওয়ালপিন্ডি থেকে মিরপুর—টানা তিন টেস্টে পাকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ জানান দিল, টেস্ট ক্রিকেটে তারা এখন আর কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, বরং এক ভয়ংকর শক্তির নাম। শান্তর অধিনায়কত্ব আর নাহিদ রানার গতির ঝড়ে মিরপুরের সন্ধ্যাটা আজ কেবল লাল-সবুজের উৎসবের।
স্কোরবোর্ড সংক্ষেপে:বাংলাদেশ: ৪১৩ ও ২৪০/৯ (ডিক্লে.)পাকিস্তান: ৩৮৬ ও ১৬৩ (লক্ষ্য ২৬৮)ফলাফল: বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী।ম্যাচের নায়ক: নাহিদ রানা (৫/৪০)।