টাইগারদের ইতিহাস: ঘরের মাঠে প্রথমবার পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশের মহাকাব্য

 প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ০১:৪৪ অপরাহ্ন   |   খেলাধুলা

টাইগারদের ইতিহাস: ঘরের মাঠে প্রথমবার পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশের মহাকাব্য

​ক্রীড়া প্রতিবেদক, সিলেট থেকে:

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের আকাশে তখন মেঘ-রোদ্দুরের খেলা, আর গ্যালারিতে হাজারো দর্শকের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। টেস্ট ক্রিকেটের চিরাচরিত রোমাঞ্চ জাগিয়ে ম্যাচের পঞ্চম দিনে তখনো চলল তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ। তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখল বাংলাদেশ। মিরপুর টেস্টের দাপুটে জয়ের ধারা সিলেটেও ধরে রেখে পাকিস্তানকে ৭৮ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এই বীরত্বগাথা জয়ের মধ্য দিয়ে দুই ম্যাচ সিরিজে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার এক নতুন অধ্যায় রচনা করল বাংলাদেশ দল। ঘরের মাটিতে টেস্টের দীর্ঘ ইতিহাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটিই প্রথম হোয়াইটওয়াশের গৌরব, যা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

​অথচ ম্যাচের চতুর্থ দিন শেষেই জয়ের সুবাস পাচ্ছিল বাংলাদেশ। অলৌকিক কোনো অঘটন না ঘটলে পাকিস্তানের হার ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ৪৩৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে ৭ উইকেটে ৩১৬ রান তুলে মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা। পঞ্চম দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩ উইকেট, আর পাকিস্তানের অলীক স্বপ্ন পূরণে চাই ১২১ রান। ক্রিকেটপ্রেমীরা যখন একটি সহজ সকালের অপেক্ষায়, তখনই টেস্ট ক্রিকেটের আদিম সৌন্দর্য ও নাটকীয়তা নিয়ে হাজির হলেন পাকিস্তানি ব্যাটাররা। অভিজ্ঞ মোহাম্মদ রিজওয়ান এবং লোয়ার-অর্ডার ব্যাটার সাজিদ খান উইকেটে জাঁকিয়ে বসে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সাবলীল ব্যাটিংয়ে তারা প্রতিপক্ষের ড্রেসিংরুমে ভয় ধরাতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখতে থাকে পাকিস্তান শিবির।

​দিনের শুরুতেই অবশ্য এই বিপজ্জনক জুটি ভাঙার মোক্ষম সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের সামনে। গতিদানব নাহিদ রানার করা একটি দুর্দান্ত ডেলিভারি রিজওয়ানের ব্যাটের প্রান্ত ছুঁয়ে স্লিপে জমা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে থাকা মেহেদী হাসান মিরাজ ক্যাচটি লুফে নিতে ব্যর্থ হলে তীব্র হতাশা ছড়ায় বাংলাদেশ শিবিরে। জীবন পেয়ে যেন আরও রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন রিজওয়ান। সাজিদ খানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দ্রুত রান তুলতে থাকেন এবং দলের জয়ের সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখেন। কোটি ভক্তের হৃদস্পন্দন তখন দ্রুততর হচ্ছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশের কান্ডারি হয়ে আবারও আলো ছড়ালেন অভিজ্ঞ বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম।

​ম্যাচের চরম উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে তাইজুল নিজের চাতুর্য ও ঘূর্ণির জাদুতে পরাস্ত করলেন ৩৬ বলে ২৮ রান করা সাজিদ খানকে। সাজিদকে ফিরিয়ে কেবল জুটিই ভাঙেননি তাইজুল, সেই সঙ্গে পূর্ণ করেন নিজের চমৎকার ফাইফার। সাজিদের বিদায়ের পর ম্যাচ হেলে পড়ে বাংলাদেশের দিকে। তবে অন্যপ্রান্তে একক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে থাকা মোহাম্মদ রিজওয়ান। ১৬৬ বলে ১০টি চারের সাহায্যে ৯৪ রানের এক লড়াকু ইনিংস খেলে যখন তিনি শতকের খুব কাছে, তখনই আঘাত হানেন পেসার শরিফুল ইসলাম। শরিফুলের বলে মিরাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে রিজওয়ান বিদায় নিলে পাকিস্তানের সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। এরপর খুররাম শেহজাদকে রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে পাঠিয়ে পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন সেই তাইজুল। মোহাম্মদ আব্বাস শূন্য রানে অপরাজিত থাকলেও পাকিস্তানের ইনিংস থামে ৩৫৮ রানে।

​পুরো ইনিংসে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাইজুল ইসলাম। ৩৪.২ ওভার বল করে ১২০ রান খরচায় একাই শিকার করেছেন ৬টি মূল্যবান উইকেট। তার এই ক্যারিয়ার-সেরা স্পিনই মূলত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে গতি তারকা নাহিদ রানা নেন দুটি উইকেট। এছাড়া শরিফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ ভাগাভাগি করে নেন একটি করে উইকেট।

​এই ঐতিহাসিক জয়ের ভিত্তিপ্রস্তর অবশ্য স্থাপিত হয়েছিল ম্যাচের প্রথম ইনিংসেই। টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে লিটন দাসের চোখধাঁধানো সেঞ্চুরির ওপর ভর করে প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রান সংগ্রহ করেছিল বাংলাদেশ। জবাবে বাংলাদেশি বোলারদের তোপে পাকিস্তান নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২৩২ রানেই থমকে যায়, যার ফলে স্বাগতিকরা ৪৬ রানের এক গুরুত্বপূর্ণ লিড পায়। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটারদের সম্মিলিত দৃঢ়তায় বাংলাদেশ ৩৯০ রানের বিশাল স্কোর দাঁড় করালে পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৩৭ রানের। রান পাহাড়ের সেই চাপ আর তাইজুলের ঘূর্ণি জাদুতে শেষ পর্যন্ত নীল হয় পাকিস্তান। মিরপুরের পর সিলেটের এই দাপুটে পারফরম্যান্স কেবল একটি সিরিজ জয় নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের টেস্ট সংস্কৃতির এক নতুন ও শক্তিশালী উত্থানের বার্তা জানান দিল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement