পল্লবীতে শিশু রামিসাকে পৈশাচিক হত্যা: ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে সারা দেশ, ৭ দিনের মধ্যে চার্জশিটের আশ্বাস
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ফুটফুটে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে টুকরো টুকরো করে হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে পুরো বাংলাদেশ। একটি সাত বছরের শিশুর ওপর এমন পৈশাচিক বর্বরতা দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। নরপশু ও বিকৃত মানসিকতার ঘাতক সোহেল রানার প্রকাশ্য ফাঁসির দাবিতে এখন রাজপথে নেমে এসেছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। দেশের প্রতিটি কোনায় বইছে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক এবং সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৯ মে সকালে, পল্লবী থানার সেকশন-১১, ব্লক-বি, রোড-৭ এর ৩৯ নম্বর বাসায়। এই ভবনে শিশু রামিসার পরিবার দীর্ঘ ১৭ বছর যাবৎ অত্যন্ত সুনামের সাথে বসবাস করে আসছিল। অথচ মাত্র দুই মাস আগে পাশের ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয় রিকশা মেকানিক মো. সোহেল রানা। ঘটনার দিন সকালে রামিসা যখন তার ফ্ল্যাটের বাইরে বের হয়, তখনই ওত পেতে থাকা সোহেল রানা তাকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। রামিসার মা পারভিন আক্তার তখন একটি চিৎকারের আওয়াজ পেয়েছিলেন, কিন্তু সেটি যে তার নিজের সন্তানের কণ্ঠ ছিল তা প্রথমে বুঝতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন রামিসা হয়তো তার বড় বোন রাইসার সাথেই বাইরে কোথাও গেছে। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়েকে একা ফিরতে দেখে মায়ের বুক কেঁপে ওঠে। তিনি তৎক্ষণাৎ চারদিকে খোঁজ শুরু করেন এবং ভবনের সব ফ্ল্যাটের দরজা ধাক্কা দিতে থাকেন। সবার দরজা খুললেও পাশের ফ্ল্যাটের দরজাটি বন্ধ ছিল। দরজার পাশে রামিসার একটি স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখে মায়ের আর বুঝতে বাকি থাকেনি যে ভেতরেই কোনো বড় বিপদ ঘটেছে। তিনি মরিয়া হয়ে দরজায় আঘাত করতে থাকেন।
ভেতরের পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়ানক ও নারকীয়। পুলিশের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ঘাতক সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার যে লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে, তা শুনে খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারাও শিউরে উঠেছেন। স্বপ্না জানায়, সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণের পর রামিসা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে রামিসার মা দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহেল রানা সিদ্ধান্ত নেয় শিশুটিকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলার। সে রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথা কেটে আলাদা করে ফেলে। এরপর স্বামী-স্ত্রী মিলে পুরো শরীর হাত-পা কেটে টুকরো টুকরো করে পলিথিনে ভরার পরিকল্পনা করে, যাতে সহজেই বাইরে ফেলে দেওয়া যায়। এমনকি প্রমাণের চিহ্ন মুছে ফেলতে তারা শিশুটির চোখ, কান ও মুখ উপড়ে ফেলার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু বাইরে মায়ের ক্রমাগত আর্তনাদ ও দরজা ভাঙার চেষ্টার কারণে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি করে সোহেল রামিসার কাটা মাথাটি বাথরুমের একটি রঙের বালতির ভেতর লুকিয়ে ফেলে এবং বাকি দেহটি টেনেহিঁচড়ে খাটের নিচে ঢুকিয়ে রাখে। এরপর বাইরে লোক জড়ো হওয়ার আশঙ্কায় সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যেখানে তার স্ত্রী স্বপ্না তাকে সম্পূর্ণ সহায়তা করে এবং ভেতর থেকে দরজা শক্ত করে লক করে রাখে যাতে কেউ ঢুকতে না পারে। পরবর্তী সময়ে পুলিশ যখন ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে স্বপ্নাকে আটক করে, তখন তার চেহারায় কোনো অনুশোচনার লেশমাত্র ছিল না, বরং তার আচরণে এক অদ্ভুত ও শীতল ঔদাসীন্য লক্ষ্য করা গেছে।
তদন্তে নেমে পুলিশ ঘাতক সোহেল রানার অতীত জীবনের আরও অনেক বিকৃত ও অন্ধকার অধ্যায়ের সন্ধান পেয়েছে। স্ত্রী স্বপ্নার ভাষ্যমতে, সোহেল দীর্ঘদিন ধরেই মারাত্মক পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ছিল এবং সাধারণ ও স্বাভাবিক যৌন জীবনে সে কখনোই সন্তুষ্ট ছিল না। সে সবসময় চরম বিকৃত যৌনাচারের চর্চা করত এবং পর্নোগ্রাফিতে দেখা বিভিন্ন অবাস্তব ও নিষ্ঠুর দৃশ্য স্বপ্নার ওপর প্রয়োগ করতে বাধ্য করত। প্রথম দিকে স্বপ্না প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও প্রতিবারই তার ওপর নেমে আসত অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। পল্লবীর অন্য এলাকায় থাকার সময় থেকেই তার এই বিকৃত মানসিকতা চরম রূপ নেয়। এমনকি গ্রামের বাড়িতেও একাধিক মেয়ের সাথে তার অনৈতিক সম্পর্ক ছিল এবং এই বিকৃত আচরণের কারণেই তার প্রথম স্ত্রীর সাথে বহু আগে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছিল।
এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজধানীসহ সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে। গত বুধবার খুনি সোহেল রানাকে যখন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়, তখন আদালত চত্বরে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সেখানে ঘাতক নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও জনতার ক্ষোভ থামেনি। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পল্লবী থানার ভেতরে ঢুকে অপরাধীর দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবিতে তুমুল বিক্ষোভ করেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যানার-ফেস্টুন হাতে রাজপথে নেমে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও এখন রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল। নেটিজেনরা রামিসার হাসিমুখের ছবি শেয়ার করে খুনিদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়ার দাবি তুলছেন। আজ শুক্রবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সব শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে একযোগে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
এই নৃশংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতার সাথে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল আসামিকে গ্রেফতার করেছে। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী বিচারের দায়িত্ব আইন বিভাগের ওপর ন্যস্ত থাকবে। একই সাথে আইনমন্ত্রীও আশ্বাস দিয়েছেন যে, এই জঘন্য অপরাধের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে এক সপ্তাহের মধ্যেই আদালতে নিখুঁত চার্জশিট দাখিল করা হবে, যাতে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।
অন্যদিকে, জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, শিশু রামিসার এই নির্মম মৃত্যু গোটা দেশের মানুষের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বর্তমান সরকার নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছে এবং এই ঘটনায় জড়িতদের এমন শাস্তি দেওয়া হবে যা ভবিষ্যতে এই ধরনের জঘন্য অপরাধ করার সাহস সবার মন থেকে চিরতরে মুছে দেবে। তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, যেভাবে অতীতে এসিড সন্ত্রাস রুখতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এই ধরনের বিকৃত অপরাধ দমনেও সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রামিসা, যে এবারও নিজের ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল, তার এই অকাল ও নির্মম বিদায় কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না কেউ। মামলাটি বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্তাধীন রয়েছে। এখন পুরো দেশের মানুষের চোখ বিচারালয়ের দিকে, যেখানে প্রত্যেকেই চায় এই নিষ্পাপ শিশুর রক্তের ফোঁটায় ফোঁটায় যেন খুনিদের জন্য সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়।