পরীক্ষার খাতায় আঁকিবুঁকি, অতঃপর শিক্ষকের অপমান: কদমতলীতে স্কুলছাত্রীর ‘আত্মহত্যা’, বিক্ষোভে উত্তাল ক্যাম্পাস
অনলাইন ডেস্ক :
নিজস্ব প্রতিবেদক: পরীক্ষার হলে খাতার পাতায় আপন মনে কিছু একটা এঁকেছিল দশম শ্রেণির কিশোরী সাবিকুন নাহার। হয়তো প্রস্তুতি ভালো ছিল না, কিংবা হয়তো কিশোরী মনের কোনো চপলতা। কিন্তু সেই সামান্য আঁকিবুঁকিই যে তার জীবনের শেষ রেখা টেনে দেবে, তা কে জানত! রাজধানীর কদমতলীতে স্কুল কর্তৃপক্ষের নির্মম মানসিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়ে এক স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে সহপাঠী ও এলাকাবাসী। উত্তাল আন্দোলনের মুখে অবরুদ্ধ থাকার পর ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মাসুদ হাসান লিটনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের হাত থেকে রেহাই পাননি তিনি; থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে গণপিটুনি দেয় উত্তেজিত জনতা।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর কদমতলীর নাসির উদ্দীন সড়ক এলাকার ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজে। নিহত সাবিকুন নাহার (১৬) ওই প্রতিষ্ঠানের মানবিক বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবার নাম খলিলুর রহমান, গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলায়। এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ—সবখানেই এখন তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বইছে।
সহপাঠী ও প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা ও অর্থনীতি বিষয়ের মডেল টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। মানবিক বিভাগের ওই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল সাবিকুনও। তবে অর্থনীতির প্রস্তুতি ভালো না থাকায় সে পরীক্ষার হলে চুপচাপ বসে ছিল এবং একপর্যায়ে খাতার এক কোণে কিছু একটা আঁকতে শুরু করে। বিষয়টি হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থনীতি বিষয়ের শিক্ষিকার নজরে এলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে সাবিকুনের খাতাটি কেড়ে নেন। এরপর খাতাটি নিয়ে সোজা হাজির হন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মাসুদ হাসান লিটনের কক্ষে।
অভিযোগ উঠেছে, এরপরই শুরু হয় মানসিক নির্যাতনের সেই নির্মম অধ্যায়। পরিচালক মাসুদ হাসান লিটন দীর্ঘ সময় ধরে সাবিকুনকে অত্যন্ত কটু ভাষায় বকাঝকা করেন এবং চরম দুর্ব্যবহার করেন। এখানেই শেষ নয়, তাৎক্ষণিকভাবে সাবিকুনের অভিভাবককে স্কুলে ডেকে পাঠানো হয়। মেয়ের সামনেই তার অভিভাবককেও সবার সামনে তীক্ষ্ণ ভাষায় গালাগাল ও অপমান অপদস্থ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানায়, স্কুল কর্তৃপক্ষের এমন আচরণে চরম হীনম্মন্যতা ও মানসিক ট্রমার মধ্যে পড়ে যায় ১৬ বছরের ওই কিশোরী। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর মনের সেই ক্ষত ও অপমান সইতে না পেরে নিজ বাসাতেই আত্মহননের পথ বেছে নেয় সাবিকুন।
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর বৃহস্পতিবার সকালে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সকাল ৮টা থেকেই শিক্ষার্থীরা কলেজের নতুন ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন রূপ নেয় গণবিক্ষোভে। দুপুরের দিকে কয়েকশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক স্কুলের প্রধান ফটক আটকে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। তারা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলে চারপাশ, দাবি তোলে সাবিকুনের মৃত্যুর জন্য দায়ী শিক্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। বিকাল পৌনে ৪টা পর্যন্ত এই বিক্ষোভ ও অবরুদ্ধ অবস্থা চলতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কদমতলী থানা পুলিশের বিশাল একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর, পুলিশ অবরুদ্ধ পরিচালক মাসুদ হাসান লিটনকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পুলিশ যখন তাকে ভ্যানে তুলছিল, তখন শিক্ষার্থীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্ডন ভেঙে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা লিটনের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ অত্যন্ত বেগতিক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে যায়।
এদিকে সাবিকুনের সহপাঠী এবং ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের ওপর এমন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাসুদ রানা লিটন এবং শিক্ষিকা মাহমুদা, সানজিদা ও রিফাতের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখানো এবং তুচ্ছ কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগ রয়েছে। সামান্য কোনো ভুলের জন্য প্রায়ই শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার বা টিসি (ছাড়পত্র) দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। অভিভাবকদের ডেকে এনে অন্য শিক্ষক ও কর্মচারীদের সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা কিংবা অপমান করা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটির এমন বৈরী ও ভীতিকর পরিবেশের কারণে বহু শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে চরম মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিল বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছিল। তাদের অভিযোগ, স্কুল কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও নির্মম দুর্ব্যবহার সহ্য করতে না পেরেই সাবিকুন নাহার আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছে পুলিশ।