সমুদ্রসীমার অতন্দ্র প্রহরী ৪৪১ নবীন নাবিক: নৌবাহিনীতে নতুন দিগন্ত
প্রতিবেদক, পটুয়াখালী
লাল-সবুজের পতাকার প্রতি বিনম্র আনুগত্য, দেশরক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার আর বিশাল সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতের শপথে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হলেন ৪৪১ জন নবীন নাবিক। পটুয়াখালীর পায়রা নদীর তীরে অবস্থিত দেশের আধুনিক নৌ ঘাঁটি 'বানৌজা শের-ই-বাংলা'র প্যারেড গ্রাউন্ডে এক জাঁকজমকপূর্ণ ও আবেগঘন শিক্ষা সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে এই নতুন ব্যাচের অন্তর্ভুক্তি সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ ২২ সপ্তাহের কঠোর ও সুশৃঙ্খল সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে এ-২০২৬ ব্যাচের এই নাবিকরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের শপথ নেন। বৃহস্পতিবারের এই ঝলমলে সকালে নবীন নাবিকদের দৃপ্ত পদচারণা আর দেশাত্মবোধক সুরের মূর্ছনায় পুরো প্যারেড গ্রাউন্ড এক অনন্য রূপ ধারণ করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্যারেড পরিদর্শন ও সশস্ত্র সালাম গ্রহণ করেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান। সুসজ্জিত মার্চ পাস্টের পর নবীন নাবিকদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন নৌপ্রধান। তিনি আধুনিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির সুরক্ষায় নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এডমিরাল নাজমুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী আজ একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এই সক্ষমতাকে আরও বেগবান করতে খুব শিগগিরই বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে আধুনিক হেলিকপ্টার, চালকবিহীন আকাশযান বা এরিয়াল ভেহিকল, মাল্টি-মিশন ইন্টারসেপ্টর এবং অত্যাধুনিক পেট্রোল বোটসহ নানাবিধ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম।
পেশাগত দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে নৌবাহিনী প্রধান নবীনদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র কেবল একক কোনো বাহিনীর ওপর নির্ভর করে না। তাই দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে সেনা ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন প্রজন্মের এই নাবিকরা সততা, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের আদর্শকে বুকে ধারণ করে নৌবাহিনীর গৌরবময় ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
দীর্ঘ ২২ সপ্তাহের এই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং প্রশিক্ষণে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শনকারীদের হাতে অনুষ্ঠানে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এবারের এ-২০২৬ ব্যাচের নবীন নাবিকদের মধ্যে সকল বিষয়ে সর্বোচ্চ উৎকর্ষ অর্জন করে সেরা চৌকস নাবিক হিসেবে 'নৌপ্রধান পদক' লাভ করেন মো. শাহরিয়ার টুটুল। এছাড়া মো. সামিউল ইসলাম শাকিল দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে 'কমখুল পদক' এবং মো. কাদের মিয়া তৃতীয় স্থান অধিকার করে 'শের-ই-বাংলা পদক' অর্জন করেন। সমসাময়িক নৌবাহিনীতে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ও সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবারও অনন্য নজির স্থাপিত হয়েছে। সেরা চৌকস মহিলা নাবিক হিসেবে 'প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার' পদক জয় করে নেন মোছা. মারিয়া আক্তার, যা দেশের নারীশক্তির এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থিত সবার প্রশংসা কুড়ায়।
আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ শেষে যখন নবীন নাবিকরা দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করেন, তখন প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত তাদের অভিভাবক ও স্বজনদের চোখে-মুখে আনন্দের পাশাপাশি এক গর্বের আভা ফুটে ওঠে। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নবীন নাবিকগণ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গৌরবময় ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে নিজেদের নাম লেখালেন। দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে মহৎ দায়িত্ব নৌবাহিনী পালন করে আসছে, আজ থেকে এই ৪৪১ জন তরুণও সেই ঐতিহ্যের অংশীদার হলেন। মনোজ্ঞ ও মর্যাদাপূর্ণ এই সমাপনী অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে নবীনদের এই নতুন জীবনের যাত্রাকে সাধুবাদ জানান।