গৌরবোজ্জ্বল পদার্পণ: বিমান বাহিনী একাডেমিতে জমকালো কুচকাওয়াজে কমিশন পেলেন ৪১ কর্মকর্তা
অনলাইন ডেস্ক:
বসন্তের বিদায়ের পর তপ্ত গ্রীষ্মের এক ঝলমলে সকালে যশোরে অবস্থিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনী একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ড সেজেছিল এক অপরূপ সাজে। দিগন্তবিস্তৃত নীলাকাশকে সাক্ষী রেখে সেখানে রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস, যেখানে দেশের আকাশসীমা রক্ষার শপথ নিলেন একঝাঁক তরুণ ও উদ্যমী সামরিক কর্মকর্তা। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ৮৮তম বাফা কোর্স, ডিরেক্ট এন্ট্রি-২০২৬ এ এবং এসপিএসএসসি-২০২৬ এ কোর্সের অফিসার ক্যাডেটদের কমিশন প্রাপ্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত 'রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ (গ্রীষ্মকালীন)-২০২৬' কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং তা ছিল দেশপ্রেম আর কঠোর সাধনার এক অনন্য মহাকাব্য।
ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই একাডেমির চত্বরে জড়ো হতে থাকেন দেশের সামরিক ও অসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের সম্মানিত সদস্য, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ নবীন কর্মকর্তাদের গর্বিত অভিভাবকগণ। কুচকাওয়াজের সুনির্দিষ্ট সময়ে প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছান অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। তাঁর উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। বিমান বাহিনী প্রধান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং মার্চ পাস্টের মাধ্যমে প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় সালাম গ্রহণ করেন। এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন তিনি নবীন ও গ্র্যাজুয়েটিং অফিসারদের মাঝে মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ মর্যাদাপূর্ণ পদক এবং ফ্লাইং ব্যাজ বিতরণ করেন।
ঐতিহ্যবাহী এই কুচকাওয়াজে অসাধারণ পারদর্শিতা দেখিয়ে সাফল্যের শিখরে নাম লেখান বেশ কয়েকজন ক্যাডেট। ৮৮তম বাফা কোর্সের প্রশিক্ষণে সব মিলিয়ে সেরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে ক্যাডেটদের সর্বোচ্চ সম্মাননা 'সোর্ড অব অনার' নিজের করে নেন অফিসার ক্যাডেট একাডেমি সিনিয়র আন্ডার অফিসার তাহসিন আহম্মেদ কোরাইশী, যিনি একই সাথে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই পুরো আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব প্রদান করেন। অন্যদিকে, উড্ডয়ন প্রশিক্ষণে আকাশে ডানা মেলার অসামান্য দক্ষতার জন্য 'বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ট্রফি' অর্জন করেন অফিসার ক্যাডেট আদনান হক। জেনারেল সার্ভিস প্রশিক্ষণে অনন্য মেধার পরিচয় দিয়ে 'কমান্ড্যান্টস্ ট্রফি' নিজের ঝুলিতে পুরেন অফিসার ক্যাডেট মোহাম্মদ আনান চৌধুরী। এই মেধাবী কর্মকর্তা গ্রাউন্ড ব্রাঞ্চেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখে লাভ করেন 'বিমান বাহিনী প্রধানের ট্রফি'। দলগতভাবে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে এই গ্রীষ্মকালীন টার্মে 'বীর উত্তম সুলতান মাহমুদ স্কোয়াড্রন' চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একাডেমি পতাকা লাভ করে।
পদক বিতরণ শেষে প্রধান অতিথি তাঁর ভাষণে এক আবেগঘন ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের। একই সাথে তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন সেই অকুতোভয় কিলো ফ্লাইটের সদস্যদের, যাঁদের হাত ধরে একাত্তরের অবরুদ্ধ সময়ে অটল মনোবল নিয়ে জন্ম হয়েছিল এই বাহিনীর। বিমান বাহিনী প্রধান উল্লেখ করেন যে, মাত্র তিনটি সাধারণ বিমান নিয়ে যে ক্ষুদ্র পরিসরের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বহু প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে এক সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আকাশসীমা নিরাপত্তার গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা, মানবিক উদ্ধার অভিযান, বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা এবং দেশ গঠনে এক অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
দেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন বিমান বাহিনীর সদস্যদের সাম্প্রতিক অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, চরম সংকটের মুহূর্তেও বিমান বাহিনীর সদস্যরা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের বিমানবন্দরগুলোর স্থবিরতা দূর করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি তাঁরা বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বর্তমানে বিমান বাহিনী কর্তৃক গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স অত্যন্ত পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা এবং সততার সাথে বিমানবন্দরসমূহে তাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছে। আধুনিকায়নের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চলমান প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত উন্নয়ন প্রচেষ্টার কথাও তিনি তাঁর বক্তব্যে জোরালোভাবে তুলে ধরেন। পরিশেষে তিনি নবীন কর্মকর্তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন এবং একাডেমির প্রশিক্ষকদের ধন্যবাদ জানান।
এবারের কুচকাওয়াজের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল নারী কর্মকর্তাদের বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ। ৫ জন উদ্যমী মহিলা অফিসার ক্যাডেটসহ মোট ৪১ জন কর্মকর্তা এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষার পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত হন। আনুষ্ঠানিক প্যারেড ও বিদায়ী বক্তব্যের পর শুরু হয় উৎসবের দ্বিতীয় পর্ব। একাডেমির বিভিন্ন আধুনিক যুদ্ধবিমানের মনোমুগ্ধকর ফ্লাইপাস্ট এবং আকাশে মেঘের বুক চিরে চোখ ধাঁধানো অ্যারোবেটিক ডিসপ্লে উপস্থিত দর্শকদের বিমোহিত করে। ঠিক যেন রূপকথার মতো, আকাশ থেকে একে একে নেমে আসেন বিমান বাহিনীর চৌকস প্যারাট্রুপাররা। হেলিকপ্টার থেকে তাঁদের এই দৃষ্টিনন্দন প্যারা জাম্পিং যেন নবীন কর্মকর্তাদের আকাশে ওড়ার নতুন স্বপ্ন ও সাহসেরই এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। কুচকাওয়াজ শেষে যখন নবীন কর্মকর্তারা তাঁদের অভিভাবকদের জড়িয়ে ধরেন, তখন আনন্দাশ্রু আর করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা যশোর বিমান বাহিনী একাডেমি।
সূত্র : বাসস