রক্তপাতহীন স্থানীয় নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জে নতুন ইসি: দলগুলোর সহযোগিতা চান সিইসি

 প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৯:২৩ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

রক্তপাতহীন স্থানীয় নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জে নতুন ইসি: দলগুলোর সহযোগিতা চান সিইসি

প্রতিবেদক, ​ঢাকা: 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ কাটতে না কাটতেই এবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে এসে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞ। তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার রক্তপাতহীন ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানকেই নিজেদের প্রধান লক্ষ্য ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বর্তমান কমিশন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের সব রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আন্তরিক সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

​বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সিইসি এই আহ্বান জানান। আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস অ্যান্ড মিশন এনফ্রেল’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

​অনুষ্ঠানে সিইসি বিদায়ী জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বরাবরই সংঘাত, সহিংসতা ও প্রাণহানির মতো ঘটনা বেশি ঘটে। তৃণমূল পর্যায়ের এই নির্বাচনগুলোতে স্থানীয় প্রভাব ও দলীয় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অতীতের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি এবার আর দেখতে চায় না কমিশন। সিইসি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো অবস্থাতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রক্তপাত বা সহিংসতা মেনে নেওয়া হবে না। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল ইসির একার পক্ষে সুশৃঙ্খল রাখা সম্ভব নয়। মাঠ পর্যায়ে শান্তি বজায় রাখতে হলে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

​স্থানীয় নির্বাচনের ব্যাপকতা তুলে ধরে সিইসি জানান, দেশজুড়ে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং প্রায় ৩৩০টি পৌরসভার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এত বিপুলসংখ্যক জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সত্যিই এক বিশাল পরীক্ষা। তবে কমিশন সব বাধা পেরিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ উপহার দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একক কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে, প্রতিটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ও রূপরেখা নির্ধারণে সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

​নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে সিইসি বলেন, দেশের প্রচলিত নিয়মে একটি কমিশন সাধারণত দুটি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার সুযোগ পায় না। একটি নির্বাচন শেষ করেই তাদের বিদায় নিতে হয় এবং নতুন কমিশন এসে আবার শূন্য থেকে কাজ শুরু করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা দূর করতে বর্তমান কমিশন তাদের কাজের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত শিখন ভবিষ্যৎ কমিশনের জন্য নথিভুক্ত করে রেখে যেতে চায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইসির চলমান কর্মশালার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গত নির্বাচনে কোথায় কোথায় ঘাটতি ছিল এবং কোন কোন জায়গায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের যে কোনো কমিশনের জন্য একটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।

​এদিকে অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘এনফ্রেল’ সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে তাদের সাত দফা সুপারিশ সম্বলিত একটি বিশদ প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে বিদায়ী জাতীয় নির্বাচনের সার্বিক স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশংসা করা হলেও কিছু কাঠামোগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়। পর্যবেক্ষক সংস্থাটি জানায়, নির্বাচনে সামগ্রিকভাবে জনমতের প্রতিফলন ঘটলেও মাঠ পর্যায়ে অর্থের অবৈধ প্রভাব এবং সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় নারী প্রতিনিধিত্বের দৃশ্যমান অভাব ছিল।

​প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যম ও তথ্য প্রবাহের পরিবেশ অত্যন্ত সক্রিয় এবং উন্মুক্ত ছিল, যা ইতিবাচক। তবে এর পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে ভোটার বা বিরোধীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো কিছু অগণতান্ত্রিক বিষয়বস্তুর উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। এনফ্রেল মনে করে, আগামী দিনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে আরও ত্রুটিমুক্ত করতে হলে এই ঘাটতিগুলো পূরণ করা জরুরি।

​জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই স্থানীয় সরকারের এই বিশাল সমীকরণ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নির্বাচনের চেয়েও স্থানীয় নির্বাচনে মাঠের সমীকরণ অনেক বেশি জটিল ও সংবেদনশীল হয়। ফলে সিইসি নাসির উদ্দিনের এই আগাম সতর্কতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সহযোগিতার আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশনের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো মাঠ পর্যায়ে কতটা সহনশীলতার পরিচয় দেয় এবং ইসি এই বিশাল চ্যালেঞ্জ কতটা সফলভাবে পাড়ি দিতে পারে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement