পুরান ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব: লালবাগে তরুণকে গুলি করে হত্যার মূল হোতাসহ গ্রেপ্তার ৩

 প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

পুরান ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব: লালবাগে তরুণকে গুলি করে হত্যার মূল হোতাসহ গ্রেপ্তার ৩

মহানগর ডেস্ক:

​রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগে কিশোর গ্যাংয়ের নৃশংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মোহাম্মদ রাফি নামের এক পঁচিশ বছর বয়সী তরুণ। স্রেফ এক ব্যক্তির সন্ধান দিতে না পারায় প্রকাশ্য রাস্তায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশি তৎপরতায় অবশেষে ধরা পড়েছে মূল হোতা ইমনসহ তিন অভিযুক্ত। গ্রেপ্তার হওয়া বাকি দুজন হলেন শাহাবুদ্দিন ও রেজাউল। ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে থাকা এই আসামিদের ঢাকা ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে মূল অভিযুক্ত ইমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জের একটি গোপন আস্তানা থেকে নয় রাউন্ড তাজা পিস্তলের গুলিও উদ্ধার করা হয়েছে।

​হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট সূত্রপাত ঘটেছিল গত ১৪ মে রাতে, লালবাগের শহীদনগর ৩ নম্বর গলির বেড়িবাঁধ এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সজিব নামের এক যুবককে হঠাৎ করেই ঘিরে ধরে এলাকার চিহ্নিত কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্য। তারা সজিবের কাছে শাহিন নামের এক ব্যক্তির খোঁজ জানতে চায়। সজিব ওই ব্যক্তিকে চেনেন না এবং দেখেননি বলে জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বখাটেরা। তারা সজিবকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করতে থাকে। এক পর্যায়ে সজিব তাদের হাত থেকে কোনোমতে ছুটে গিয়ে পরিচিত বড় ভাই এবং স্থানীয় অনলাইন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রাফিকে তার বাসা থেকে ডেকে আনেন। রাফিকে সাথে নিয়ে সজিব যখন বিষয়টি মীমাংসা করতে পুনরায় ওই যুবকদের সামনে যান, তখনই পরিস্থিতি হিংস্র রূপ নেয়। শাহিনের তথ্য দিতে না পারার ক্ষোভ এবং সজিব কেন লোক ডেকে এনেছে—এই অজুহাতে গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রথমে রাফিকে মারধর করে। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসী ইমন তার কোমর থেকে পিস্তল বের করে রাফির ডান পাঁজর লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালিয়ে দেয়। গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ইমনের সঙ্গে থাকা রেজাউল, মিন্টু, শাহাবুদ্দিনসহ আরও আট-নয়জন সহযোগী দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

​রক্তাক্ত অবস্থায় রাফি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সজিব ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রাফির শরীরের ভেতরে গুলিটি মারাত্মক ক্ষতি করায় এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় ঘটনার দিন রাতেই তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে এক সপ্তাহ ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত বুধবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ। রাফির দুলাভাই আব্দুস সাত্তার জানান, রাফি অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিলেন। অনলাইনে ব্যবসার পাশাপাশি নিজের একটি বাসা ভাড়া দিয়ে প্রাপ্ত টাকাতেই অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে তাদের সংসার চলত। কোনো ধরনের অপরাধ বা গ্যাং কালচারের সঙ্গে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না। স্রেফ একজনকে না চেনার অপরাধে এভাবে একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাবে, তা পরিবারের কেউ মেনে নিতে পারছেন না। রাফির মৃত্যুর পর তার স্বজনরা বাদী হয়ে লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

​হত্যাকাণ্ডের পরপরই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে মাঠে নামে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, রাফি গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে শাহাবুদ্দিন ও রেজাউলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে মূল শুটার ইমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকার বাইরে পালিয়ে গেছে। বিশেষ গোয়েন্দা দল তাৎক্ষণিকভাবে কক্সবাজারে অভিযান পরিচালনা করে বুধবার মধ্যরাতে ইমনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

​পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইমন অপরাধের কথা স্বীকার করেছে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই কেরানীগঞ্জের একটি বাড়ি থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের গুলি জব্দ করা হয়। ডিএমপির মিডিয়া সেন্টার থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার মূল রহস্য সম্পূর্ণভাবে উদঘাটন করতে এবং এই কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে কোনো গডফাদার বা বড় ভাইদের ইন্ধন রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশি তদন্ত ও রিমান্ডের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। পুরান ঢাকার মতো জনাকীর্ণ এলাকায় এমন প্রকাশ্য অস্ত্রবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এখনো তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা এই কিশোর গ্যাংয়ের স্থায়ী নির্মূল এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement