পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা: এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশ আইনমন্ত্রীর, ঘাতকের লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি
মহানগর ডেস্ক:
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে কেটে টুকরো টুকরো করে হত্যার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে শেষ করতে এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমকে এই নির্দেশনার কথা জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুটির পরিবারের পাশে রয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে যথাযথ সব ধরনের আইনি উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকার এই মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে যাতে কোনো লুপহোল বা আইনি ফাঁকফোকর গলে খুনি পার পেয়ে যেতে না পারে।
গত মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর একটি আবাসিক ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরবর্তীতে বাথরুমের ভেতর থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই রোমহর্ষক ও ক্লুলেস ঘটনার পরপরই পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ঘটনার ছায়া তদন্তে নামে গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাবের একাধিক টিম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে হাজির করা হলে সে বিচারকের সামনে নিজের অপরাধের বিবরণ দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। আদালতে দেওয়া ঘাতক সোহেলের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে সেই সকালের গা শিউরে ওঠা চরম নৃশংসতার চিত্র।
আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা নিজের ঘর থেকে বের হলে পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে ডেকে তাদের ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর নেশাগ্রস্ত সোহেল রানা শিশুটিকে জোরপূর্বক বাথরুমে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও ভয়ে ছোট্ট রামিসা একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ঠিক সেই মুহূর্তেই নিজের সন্তানকে দীর্ঘক্ষণ না দেখে রামিসার মা ব্যাকুল হয়ে সোহেলের বাসার দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। বাইরে মায়ের চিৎকার ও দরজার আওয়াজ শুনে ভেতরে ঘাতক সোহেল আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিজের অপরাধ ধামাচাপা দিতে সে বাথরুমেই রামিসাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলাকেটে হত্যা করে।
এরপরের দৃশ্য ছিল আরও বেশি বীভৎস ও অমানবিক। রামিসার মৃত্যু নিশ্চিত করার পর মরদেহ চিরতরে গুম করার উদ্দেশ্যে সোহেল রানা একটি ধারালো ছুরি দিয়ে তার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এখানেই শেষ নয়, সে দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক কেটে আলাদা করে ফেলে এবং লাশটি বাথরুম থেকে টেনে এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। আলামত নষ্ট এবং ক্ষোভের বশে সে শিশুটির যৌনাঙ্গও ছুরি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। এই পুরো নৃশংস হত্যাকাণ্ড যখন ঘটছিল, তখন সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার একই ঘরের ভেতরে উপস্থিত থেকে স্বামীকে সহযোগিতা করছিল বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে রামিসার মায়ের আকুলতায় প্রতিবেশীরা জড়ো হতে শুরু করলে বেগতিক দেখে ঘরের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় মূল ঘাতক সোহেল রানা।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দিতে ঘাতক সোহেল স্বীকার করেছে যে, ঘটনার ঠিক পূর্বে সে মারাত্মক মাদক ইয়াবা সেবন করেছিল। তীব্র মাদকের নেশা এবং বিকৃত মানসিকতার কারণেই সে এই পাশবিক কাণ্ড ঘটিয়েছে। সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, ভুক্তভোগী শিশু রামিসার পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব শত্রুতা তো দূরের কথা, কোনো ধরনের বিরোধ বা মনোমালিন্যও ছিল না। নিতান্তই প্রতিবেশি হিসেবে তাদের মধ্যে সাধারণ যোগাযোগ ছিল। মাদকের নীল দংশন কীভাবে একটি জলজ্যান্ত শিশুকে পশুর মতো হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে, এই ঘটনা যেন দেশবাসীকে আবার সেই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।
এদিকে গত বুধবার রাতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামের মোল্লাবাড়িতে নিজ পারিবারিক কবরস্থানে অশ্রুসিক্ত নয়নে রামিসার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তার জানাজায় এলাকার শত শত মানুষ অংশ নেন এবং পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রামিসার অকাল ও নৃশংস মৃত্যুতে পুরো এলাকায় এখনো শোকের ছায়া নেমে আছে এবং স্থানীয়রা খুনি সোহেল ও তার স্ত্রীর দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করছেন। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং আইনমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই বিজ্ঞ আদালতে নিখুঁত চার্জশিট দাখিল করা হবে, যাতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই পৈশাচিক খুনের রায় ঘোষণা করা যায়।