খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ৪৮ ঘণ্টায় স্বীকারোক্তি: রামিসা হত্যার দ্রুত বিচারের আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

 প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৫:৩৮ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ৪৮ ঘণ্টায় স্বীকারোক্তি: রামিসা হত্যার দ্রুত বিচারের আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

প্রতিনিধি, ঢাকা :

​রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা দেশ। নিস্পাপ এক শিশুর এমন নৃশংস পরিণতি সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে, জন্ম দিয়েছে তীব্র জনরোষের। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকাবাসীর উদ্বেগ ও রামিসার পরিবারের আহাজারির জবাব দিতে এগিয়ে এসেছে সরকার। বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করা হবে। অপরাধী পার পাবে না এবং এই ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

​সাপ্তাহিক কর্মদিবসের দুপুরে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাদক, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ বা আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। নতুন সরকার গঠনের পর এ ধরনের জঘন্য অপরাধ—বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপরতা দেখিয়েছে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। নৃশংস এই ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল আসামিকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে এবং সে ইতিমধ্যেই নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে।

​মন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, পুলিশ কমিশনারকে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। একই সঙ্গে আদালতের সঙ্গে সমন্বয় করে বিচারিক প্রক্রিয়াও যেন দ্রুততম সময়ে শেষ হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দেশে প্রচলিত 'বিচারহীনতার সংস্কৃতি'র যে সমালোচনা সবসময় করা হয়, তা পুরোপুরি সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার কারণে রায় আসতে বিলম্ব হয়, কারণ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। কুমিল্লায় বহুল আলোচিত তনু হত্যাকাণ্ডসহ পূর্ববর্তী বিভিন্ন স্পর্শকাতর মামলায় সরকারের পক্ষ থেকে আইনি ব্যবস্থা সচল রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রামিসা হত্যার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো দীর্ঘসূত্রতা বরদাশ করব না।

​তবে দ্রুত বিচারের তাগিদ থাকলেও তাড়াহুড়ো করে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারের তিন মাসের সংক্ষিপ্ত মেয়াদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। আইন সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং যুগের প্রয়োজনে কিছু কিছু ধারায় সংশোধন আনা হবে। কিন্তু জনগণের সাময়িক ক্ষোভ প্রশমন করার জন্য তড়িঘড়ি করে কোনো আইন প্রণয়ন বা সংক্ষিপ্ত বিচারের নামে যেন কোনো অবিচার না হয়ে যায়, সেদিকেও সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

​এদিকে রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। বৃহস্পতিবার সকালেই আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, মাগুরার আছিয়া কিংবা ঢাকার রামিসা—এই শিশুগুলোর ওপর হওয়া নির্যাতন আমাদের সামগ্রিক মনুষ্যত্বকে আজ বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাষ্ট্র এই ধরনের অপরাধকে কোনোভাবেই ‘আনচ্যালেঞ্জড’ বা পার পেয়ে যেতে দেবে না। তিনি জানান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়াকে অতি দ্রুত সম্পন্ন করতে পারলে সন্তানহারা বাবার বুকফাটা আর্তনাদ ও প্রশ্নের জবাব দেওয়া সম্ভব হবে। তবে রায় কার্যকর করার বিষয়টি সম্পূর্ণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না, বরং আইনি সহায়তা ত্বরান্বিত করা হবে।

​পুরো ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত মঙ্গলবার সকালে, যখন মিরপুরের পল্লবীর একটি আবাসিক ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে সাত বছরের শিশু রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরবর্তীতে বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই লোমহর্ষক ঘটনার পর পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হলে পুলিশি অভিযানে নামে। প্রথমে প্রধান আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয় এবং পরে মূল উপাখ্যানের খলনায়ক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ও পরবর্তীতে আদালতে হাজির করা হলে, শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় ঘাতক সোহেল রানা। এই বর্বরোচিত ঘটনার পর পুরো পল্লবী এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে খুনি সোহেল রানার ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement