মিরপুরে ৮ বছরের শিশুকে নৃশংস হত্যা: দাদা-দাদির পাশে চিরনিদ্রায় রামিসা, ঘাতক সোহেলের স্বীকারোক্তি
মহানগর ডেস্ক:
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে পাশবিক নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে খুন হওয়া আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার অবশেষে তার চিরচেনা মাটির টানে ফিরে গেছে। বুধবার রাত ৯টার দিকে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামের মোল্লাবাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে রাত ৮টার দিকে ঢাকা থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে রামিসার নিথর দেহ গ্রামে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সন্তানহারা মা-বাবার আর্তনাদ আর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গ্রামীণ আকাশ। আদরের রামিসাকে শেষবারের মতো দেখতে আসা শত শত প্রতিবেশীর চোখে ছিল অশ্রু আর মুখে ছিল খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি। পুরো এলাকায় নেমে আসে এক গভীর ও স্তব্ধ শোকের ছায়া।
নিহত রামিসা সিরাজদীখানের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামের বাসিন্দা হান্নান মোল্লার মেয়ে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সে মিরপুরের পল্লবী এলাকার একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে থাকত। গত মঙ্গলবার সকালে সেই চেনা পরিবেশটাই রামিসার জন্য নরকে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ থাকার পর একপর্যায়ে ওই ভবনেরই একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরবর্তীতে বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে খোদ রাজধানীসহ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনার পরপরই পুলিশ তদন্তে নেমে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে এবং পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তীতে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের স্তব্ধ করে দেওয়া বিবরণ উঠে এসেছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত আসামি সোহেল রানা বিজ্ঞ বিচারকের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে সোহেল জানায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা যখন নিজ ঘর থেকে বাইরে বের হয়েছিল, তখন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে ফুসলিয়ে নিজেদের ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে সোহেল। তীব্র নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে নিষ্পাপ শিশুটি।
নিজের অপকর্ম ঢাকতে এবং অবুঝ শিশুটি যেন কাউকে কিছু বলতে না পারে, সেজন্য চরম নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেয় সোহেল। জ্ঞানহীন রামিসাকে বাথরুমের ভেতরেই গলা কেটে হত্যা করা হয়। এরপর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। দেহটি ঘরের ভেতরের একটি খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হলেও মাথাটি বাথরুমেই ফেলে রাখা হয়েছিল। এই জঘন্য অপরাধে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার সরাসরি সহায়তা করেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর কোনো মোটিভ বা অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। নিষ্পাপ এই শিশুকে এভাবে অকালে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় শুধু একটি পরিবারই ধ্বংস হয়নি, বরং তা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক বড় চপেটাঘাত। এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার এখন শুধু একটাই প্রার্থনা করছেন—আইনি প্রক্রিয়া যেন দ্রুত শেষ করে খুনি সোহেল ও তার সহযোগীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।