কাগজে আছেন, হাসপাতালে নেই: দৌলতপুরের চার লাখ মানুষের চিকিৎসা যখন ‘প্রেষণ’ বন্দি

 প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ০৮:১৩ পূর্বাহ্ন   |   ঢাকা

কাগজে আছেন, হাসপাতালে নেই: দৌলতপুরের চার লাখ মানুষের চিকিৎসা যখন ‘প্রেষণ’ বন্দি
​মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি :
​মফস্বলের শেষ বিকেলের আলো তখন ম্লান হয়ে আসছে। মানিকগঞ্জের দুর্গম চরাঞ্চল যমুনা নদী পেরিয়ে কোলঘেঁষা দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের সামনে কোলে ছটফট করা দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন রহিমা বেগম। তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছে শিশুটি। কিন্তু হাসপাতালে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ নেই। কাগজে-কলমে এই হাসপাতালের জন্য একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বরাদ্দ থাকলেও, তিনি এখন দায়িত্ব পালন করছেন রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। রহিমা বেগমের মতো প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে বুকভরা আশা নিয়ে এই সরকারি হাসপাতালে এসে চরম হতাশা আর ক্ষোভ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। কাগজে-কলমে চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত জনবল থাকলেও বাস্তবে হাসপাতালটি যেন এক শূন্যতার প্রতিচ্ছবি। সরকারি নথিতে পদায়ন হওয়া চিকিৎসকদের নাম জ্বলজ্বল করলেও, ‘প্রেষণ’ বা ‘সংযুক্তি’ নামক এক অদ্ভুত প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে তারা বছরের পর বছর ধরে ডিউটি করছেন ঢাকা কিংবা জেলা সদরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক সব হাসপাতালে। ফলে যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীবেষ্টিত এই দুর্গম উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষের একমাত্র চিকিৎসাস্থলটি এখন নিজেই যেন আইসিইউতে চলে গেছে।
​হাসপাতালের প্রশাসনিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দিলেও সাধারণ মানুষ তার কোনো সুফল পাচ্ছে না। জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ইউরোলজি) ডা. মুহা. ইফতেখারুল ইসলামকে দৌলতপুরের মানুষ কখনো দেখেনি বললেই চলে, কারণ তিনি সংযুক্ত আছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একইভাবে সার্জারি বিভাগের ডা. মো. ইমাদ হোসেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এবং অ্যানেসথেসিয়া, চক্ষু এবং চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের চিকিৎসকেরা মানিকগঞ্জ কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরামদায়ক পোস্টিংয়ে দিন কাটাচ্ছেন। শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাই নন, বেশ কয়েকজন মেডিকেল অফিসারও তদবিরের জোরে ঢাকায় নিজেদের বদলি বা সংযুক্তি টিকিয়ে রেখেছেন। এর ফলে গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন এবং বাধ্য হয়ে সামান্য জটিলতার জন্যই চড়া ভাড়ায় নৌকা ও সিএনজি চেপে জেলা সদর কিংবা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছেন। অনেক সময় পথেই মারা যাচ্ছেন মুমূর্ষু রোগী।
​চিকিৎসক সংকটের এই মরণকামড়ের পাশাপাশি হাসপাতালটিতে চলছে তীব্র চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও মিডওয়াইফ বা ধাত্রী সংকট। ২০৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪০টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বিশেষ করে গ্রামীণ প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করার জন্য যেখানে সাতজন মিডওয়াইফ থাকার কথা, সেখানে আছেন মাত্র দুজন। এই দুজনকে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে, চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের মধ্যে ১০টিই খালি থাকায় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং রোগীদের দেখভাল করার মতো কোনো মানুষ পাওয়া যায় না। দুর্গন্ধময় পরিবেশ আর নোংরা বিছানার মধ্যেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই ডিজিটাল বাংলাদেশেও হাসপাতালটিতে এখনো মধ্যযুগীয় অ্যানালগ এক্স-রে মেশিন দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। আধুনিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হলেও, সেগুলো বাক্সবন্দি হয়ে ধুলো জমছে বছরের পর বছর ধরে, কারণ এগুলো চালানোর মতো কোনো দক্ষ টেকনিশিয়ান বা অপারেটর নেই। পুরো উপজেলার বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি রোগী পরিবহনের একমাত্র ভরসা মাত্র একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স, যা অধিকাংশ সময়ই নষ্ট থাকে কিংবা জ্বালানি সংকটের অজুহাতে গ্যারেজেই পড়ে থাকে।
​এই চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যেও প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে ৬০ থেকে ৭০ জন এবং জরুরি বিভাগে প্রায় ৩০ জন রোগী যাতায়াত করেন। অন্তর্বিভাগে গড়ে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী, যাদের সিংহভাগই এই অঞ্চলের নদী অববাহিকার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট ও সিওপিডির মতো জটিল ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত। কিন্তু ইনডোরে ভর্তি হওয়া এই রোগীরা ঠিকমতো ওষুধ ও অক্সিজেন পান না বলে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার প্রতি বছর বাজেটে কোটি কোটি টাকা দিচ্ছে, চিকিৎসকদের বেতন হচ্ছে দৌলতপুরের নামে, অথচ তারা সেবা দিচ্ছেন ঢাকার বড় বড় হাসপাতালে। এটা এই অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের সাথে এক ধরনের প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। দরিদ্র রোগীরা দালালের খপ্পরে পড়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
​এই কাঠামোগত বিপর্যয় ও জনবল সংকটের সত্যতা স্বীকার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেহেরুবা পান্না অত্যন্ত অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি জানান, চিকিৎসকদের এই সংযুক্তির কারণে স্থানীয়ভাবে রোগীদের নিয়মিত ও মানসম্মত সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করার জন্য এবং প্রেষণে থাকা চিকিৎসকদের ফিরিয়ে আনার জন্য বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো সুরাহা মেলেনি। অন্যদিকে, মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম মোফাখখারুল ইসলাম এই সংকটের পেছনে ভৌগোলিক কারণকে দায়ী করে বলেন, দৌলতপুর অত্যন্ত দুর্গম ও চরাঞ্চল হওয়ায় চিকিৎসকেরা সেখানে বেশিদিন থাকতে চান না এবং নানাভাবে তদবির করে ঢাকা বা সদরে চলে আসেন। চিকিৎসকদের ধরে রাখা এই অঞ্চলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তিনি আশ্বাস দেন যে, পর্যায়ক্রমে এই জনবল সংকট দূর করতে এবং সংযুক্তি বাতিল করে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু সিভিল সার্জনের এই আশ্বাসের বাণী রহিমার মতো হাজারো চরাঞ্চলবাসীর কান্না থামাতে পারছে না, যাদের কাছে প্রতিটি দিনই জীবন-মৃত্যুর এক নির্মম লড়াই।
Advertisement
Advertisement
Advertisement