আদালত প্রাঙ্গণে ভিআইপি বন্দিদের হাঁসফাঁস: ‘এই গরমে মরেই যাব’

 প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

আদালত প্রাঙ্গণে ভিআইপি বন্দিদের হাঁসফাঁস: ‘এই গরমে মরেই যাব’

মহানগর ডেস্ক:

​মে মাসের তীব্র দাবদাহে পুড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশ। পিচগলা গরমে যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, তখন সেই একই রকম হাঁসফাঁস অবস্থা দেখা গেল এক সময়ের প্রতাপশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বদের মাঝেও। কড়া নিরাপত্তা, ভারী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আর হেলমেটের নিচে ঢাকা পড়েছিল তাদের চিরচেনা অবয়ব। বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানকে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়, তখন চারপাশের পরিবেশ ছিল বেশ থমথমে।

​কড়া পুলিশি পাহারায় প্রিজন ভ্যানটি এসে থামার পরপরই শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা। নিয়ম অনুযায়ী গাড়ি থেকে নামানোর সাথে সাথেই সালমান এফ রহমানের হাতে পরানো হয় হাতকড়া, আর গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় ভারী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট। মে মাসের ভ্যাপসা গরমে এই বাড়তি ওজনের পোশাকে দম আটকে আসার উপক্রম হয় তার। তীব্র অসন্তোষ ও বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলে ওঠেন, ‘এই গরমে এসব পরে মরেই যাব। অনেক গরম, খুব গরম।’ তার এই আকুলতা উপস্থিত সংবাদকর্মী এবং আদালত সংশ্লিষ্টদের নজর কাড়ে, যা ছিল এক সময়ের ক্ষমতাধর এই ব্যক্তির বর্তমান অসহায়ত্বের এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

​সালমান এফ রহমানের পর প্রিজন ভ্যান থেকে একে একে নামানো হয় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানকে। মানি লন্ডারিং আইনের আলাদা দুটি মামলায় আজ তাদের আদালতে হাজিরার দিন ধার্য ছিল। ক্ষমতাচ্যুতির পর আইনি বেড়াজালে বন্দি এই তিন হাইপ্রোফাইল আসামিকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিলেন বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য। রোদ আর গুমোট গরমের মাঝে তাদের দ্রুত আদালতের হাজতখানার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত প্রাঙ্গণে তাদের দেখার জন্য উৎসুক জনতার ভিড় থাকলেও কঠোর নিরাপত্তার কারণে কাউকেই কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি।

​এই তিনজনকে হাজতখানায় নেওয়ার ঠিক মিনিট পাঁচেক পর আদালত প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছায় আরেকটি প্রিজন ভ্যান। সেখান থেকে নামানো হয় সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে মোহাম্মদপুরে মালবাহী ট্রাকচালক মো. হোসেনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তাকে আজ হাজির করা হয়েছিল। তবে পলকের আগমনী দৃশ্য ছিল বাকিদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তার মাথায় কোনো হেলমেট ছিল না, আর শরীরী ভাষায় ছিল তীব্র অসুস্থতার ছাপ।

​পুলিশ সদস্যদের কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন জুনাইদ আহমেদ পলক। শারীরিকভাবে তাকে বেশ দুর্বল ও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন এগিয়ে আসতে দেখে তিনি মলিন মুখে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে আসছি, দোয়া করবেন। ব্যথা এখনও রয়েছে।’ তবে ঠিক কোন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে তাকে সরাসরি আদালতে আনা হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তিনি বা তার সাথে থাকা পুলিশ সদস্যরা জানাননি।

​তীব্র গরমের অস্বস্তি, আইনি প্রক্রিয়ার কঠোরতা আর বন্দি জীবনের বাস্তবতায় সাবেক এই শীর্ষ কর্তাদের আদালত হাজিরার দৃশ্যটি ছিল বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক চাক্ষুষ দলিল। হাজতখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের চোখে-মুখে ফুটন্ত রোদের চেয়েও যেন বেশি ভর করেছিল ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের ক্লান্তি।

Advertisement
Advertisement
Advertisement