এক কার্ডেই মিলবে সব সুবিধা: আসছে সমন্বিত ‘ফ্যামিলি ট্রি’, বন্ধ হবে ভাতার ডাবল বুকিং
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে এক যুগান্তকারী ও আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এনালগ ও বিচ্ছিন্ন ভাতা ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে এবার একটি সমন্বিত ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক তথ্যভাণ্ডার নামক দূরদর্শী নেটওয়ার্কিং সিস্টেম চালুর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের এই নতুন মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে একটি একক, সুসংগত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। এর ফলে একই ব্যক্তি বা পরিবারে ভিন্ন ভিন্ন সরকারি সরকারি সুবিধা বা ভাতা পাওয়ার দ্বৈততা, যা সাধারণ ভাষায় ‘ডাবল বুকিং’ নামে পরিচিত, তা চিরতরে বন্ধ হবে। একই সাথে নিশ্চিত হবে প্রকৃত অভাবী ও যোগ্য মানুষের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার, যার ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত এই আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি মূলত ইউরোপ বা আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর আদলে তৈরি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সোশ্যাল কার্ড’ ব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় প্রান্তিক মানুষেরা মাত্র একটি কার্ড এবং উন্নত কিউআর কোড (QR Code) ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রদত্ত সমস্ত সামাজিক নিরাপত্তা সেবা এক ছাদের নিচে পেয়ে যাবেন। সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে সরকারের এই নতুন দূরদর্শী পরিকল্পনা ও চলমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির নানা খুঁটিনাটি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন। তিনি মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
সরকারের বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী জুনের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার মানুষকে এই ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এই অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, সরকার মূলত অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পর্যায়ক্রমে বা 'ফেজ বাই ফেজ' অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমানে এই কার্ডের পাইলটিং কার্যক্রম চলছে যা আগামী জুনের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। যেকোনো বড় প্রকল্পের শুরুতে পাইলটিং করার মূল উদ্দেশ্যই হলো ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ বা ভুল-ত্রুটি থেকে শেখা, যাতে মাঠ পর্যায়ের ছোটখাটো সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান বের করা সম্ভব হয়।
মাঠ পর্যায়ে এই কার্ড বিতরণের পর প্রান্তিক মানুষের মধ্যে ব্যাপক ও ইতিবাচক সাড়া লক্ষ্য করা গেছে। প্রথম ধাপে যারা এই কার্ড বা বেনিফিশিয়ারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, তারা এই উদ্যোগের ফলে অত্যন্ত আনন্দিত। তবে এই কার্যক্রমটি যেহেতু অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একটি একটি করে ওয়ার্ড ধরে পরিচালনা করা হচ্ছে, তাই পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন বা উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যেও এই কার্ড পাওয়ার জন্য একটি তীব্র ইতিবাচক আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, জনগণের এই বিপুল চাহিদাই প্রমাণ করে যে, সরকার যে জনকল্যাণমুখী উদ্দেশ্যে এই ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রামটি হাতে নিয়েছে, তা সফলভাবে তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে। নতুন সরকার গঠনের পরপরই এই জটিল ও বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, বর্তমান প্রশাসন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক ও দায়বদ্ধ।
এই সমগ্র কর্মসূচির অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল কাজ হচ্ছে প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি টাকা পৌঁছে দেওয়া। যার প্রাপ্য টাকা যেন সরাসরি তার ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে চলে যায়, তা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন নিবিড়ভাবে ‘ডেটা ফাইন্ডিং’ বা তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। উল্লেখ্য, গত ১৬ মে চাঁদপুর জেলা থেকে এই কর্মসূচির অত্যন্ত সফল দ্বিতীয় ধাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আরও ২০টি ওয়ার্ডে নতুন করে এই ডিজিটাল কার্ডের সুবিধা চালু করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী জুনে তৃতীয় ধাপে আরও ১৮টি উপজেলায় অত্যন্ত জোরালোভাবে এই কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে, যেখানে মাঠ পর্যায় থেকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন করে কার্ড বিতরণ করা হবে।
ভবিষ্যতে দেশের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বদলে দিতে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ নামক যে পারিবারিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে, তা সরাসরি জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি (NID) ডেটাবেজের সাথে সংযুক্ত থাকবে। এর ফলে একটি একক ডিজিটাল আইডির অধীনে এক ক্লিকেই জানা যাবে কোনো নির্দিষ্ট পরিবার রাষ্ট্র থেকে এই মুহূর্তে কী কী সুবিধা বা ভাতা ভোগ করছে। এই ব্যবস্থার ফলে একজন ব্যক্তি কোনোভাবেই জালিয়াতি করে বা একসঙ্গে দুটি ভিন্ন ভাতা নিতে পারবেন না। তবে এই কঠোর নিয়মের মধ্যেও মানবিক দিকটি বিবেচনা করা হয়েছে; পরিবারের প্রধানের একটি কার্ডের কারণে অন্য সদস্যদের প্রয়োজনীয় কার্ড বা প্রতিবন্ধী ভাতা কোনোভাবেই বন্ধ হবে না, বরং তা যথানিয়মে সচল থাকবে।
বর্তমানে এই ফ্যামিলি কার্ডের মাসিক ভাতার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে সরকারের নিয়মানুযায়ী, যারা বর্তমানে ৫০০ বা ১০০০ টাকার বয়স্ক বা বিধবা ভাতা পাচ্ছেন, তারা যদি এই নতুন এবং অধিক অঙ্কের ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা নিতে চান, তবে তাদের আগের কম অঙ্কের ভাতাটি নিয়মমাফিক ‘সারেন্ডার’ বা ত্যাগ করতে হবে। ভবিষ্যতে কৃষক কার্ড এবং হেলথ কার্ডসহ সরকারের সমস্ত সামাজিক নিরাপত্তা কার্ডকে এই একটি মাত্র ব্যবস্থার অধীনে একীভূত করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। আমাদের গ্রামীণ ও সামাজিক বাস্তবতায় একই পরিবারে একজন প্রান্তিক কৃষক, একজন গর্ভবতী মা কিংবা একজন প্রবীণ বিধবা নারী থাকতে পারেন। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সময় যদি স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে দেখা যায় যে উপযুক্ত নারীটি এরই মধ্যে অন্য কোনো বিধবা বা বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন, তবে ডাবল বুকিং রোধের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী তাকে আগের কার্ডটি ত্যাগ করতে হবে। তবে এর পাশাপাশি তার স্বামী যদি আলাদাভাবে কৃষক কার্ড নেন বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য প্রতিবন্ধী ভাতা পান, তবে তা সম্পূর্ণ সচল ও কার্যকর থাকবে।
সবগুলো মন্ত্রণালয় মিলে এমন একটি নিরেট ও নিশ্ছিদ্র ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাচ্ছে, যা দুর্নীতি ও অনিয়মকে পুরোপুরি জাদুঘরে পাঠিয়ে দেবে। একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করার সাথে সাথেই উপকারভোগীর সমস্ত নাড়িনক্ষত্র এবং পূর্ববর্তী ভাতার ইতিহাস স্ক্রিনে চলে আসবে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে অতীতে ভাতা বণ্টন নিয়ে যেসব বিশৃঙ্খলা বা জালিয়াতি তৈরি হতো— বিশেষ করে একজনের নামের বরাদ্দকৃত কার্ডের টাকা অসদুপায় অবলম্বন করে অন্যজনের অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, সেই অনিয়ম ও ডিজিটাল জালিয়াতি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে।
এই বিশাল কার্যক্রমে যোগ্য ও প্রকৃত দরিদ্র ব্যক্তি বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবে নয়, বরং সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ বা পিএমটি (PMT) মেথডে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই অত্যাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের পদ্ধতিতে আবেদনকারীর জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মূল্যায়ন করা হয়। যেমন— আবেদনকারীর ঘরে টেলিভিশন বা ফ্রিজ আছে কি না, পরিবারের স্যানিটেশন ব্যবস্থা কেমন, কিংবা তাদের বসতবাড়ির ছাদের অবস্থা কেমন বা তা কী দিয়ে তৈরি— এমন অসংখ্য বাস্তবমুখী সূচকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্কোরিং করা হয়। এই বৈজ্ঞানিক স্ক্রিনিংয়ে যাদের স্কোর ৮১৪-এর নিচে থাকবে, অর্থাৎ যারা সত্যিকার অর্থেই ‘অতি দরিদ্র’ হিসেবে চিহ্নিত হবেন, কেবল সেই পরিবারগুলোই এই মর্যাদাপূর্ণ কার্ডের জন্য নির্বাচিত হবে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান ও মূল অঙ্গীকার হলো দেশের প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। এই নতুন ফ্যামিলি কার্ডের মূল দর্শনই হলো গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত অবহেলিত নারীদের হাতে সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থ পৌঁছে দিয়ে সমাজের মূল স্রোতে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া।
তবে এত বড় একটি কর্মযজ্ঞে মাঠপর্যায়ে কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়ম বা অভিযোগের খবরও প্রশাসনের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ ও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, পাইলটিং করার মূল উদ্দেশ্যই হলো মাঠের বাস্তব সমস্যা এবং ভেতরের কালো হাতগুলোকে খুঁজে বের করা। যেখানেই কোনো ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা কার্ড দেওয়ার নামে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সরকার কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে সেখানে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে এমন একটি জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত একজনকে হাতেনাতে ধরে পুলিশের সোপর্দ করা হয়েছে। সরকার এবং প্রকৃত উপকারভোগীর মাঝখানে কোনো ধরনের দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না এবং এই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রশাসন সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতিতে অটল রয়েছে।