রক্তের বাঁধন ছিঁড়েছে যে অবহেলায়: শেষ বিদায়েও পাশে নেই স্ত্রী-সন্তান, মর্গ থেকে কবরে ‘বেওয়ারিশ’ খোকন মিয়া
নিজস্ব প্রতিবেদক | ব্রাহ্মণবাড়িয়া
পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই—এমন মানুষের শেষ বিদায় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে হওয়াটা হয়তো নিয়তি। কিন্তু স্ত্রী আর দুই সামর্থ্যবান ছেলে থাকার পরও একজন বাবার মরদেহ পাঁচ দিন মর্গে পড়ে থাকা এবং শেষ পর্যন্ত পরিচয়হীনভাবে দাফন হওয়া কেবল নিয়তি নয়, বরং মানবিকতার চরম পরাজয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ৩৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে অবশেষে হার মানা খোকন মিয়ার গল্পটি কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতার প্রতিফলন।
গল্পের শুরুটা গত ২৪ মার্চের। শরীরের গুরুতর ক্ষত (সেলুলাইটিস) আর এক বুক নিঃসঙ্গতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন খোকন মিয়া। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে আনলেও দীর্ঘ ৩৮ দিন তার শিয়রে কেউ ছিল না। হাসপাতালের নার্স আর ‘বাতিঘর’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরাই ছিলেন তার শেষ জীবনের পরম আত্মীয়। অস্পষ্ট কণ্ঠে খোকন মিয়া শুধু নিজের নাম আর কুমিল্লার একটি ঠিকানার কথা বলতে পেরেছিলেন। সেই অস্পষ্ট কথা আর জাতীয় পরিচয়পত্রের সূত্র ধরে যখন তার পরিবারের সন্ধান মিলল, তখন সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো মানুষটি আপনজনের ছায়া পাবেন।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। কুমিল্লার দেবিদ্বারের করুইন গ্রামে থাকা স্ত্রী নিলুফা আক্তার এবং দুই ছেলে রাজু ও রানা সাফ জানিয়ে দিলেন—তারা কোনো দায়িত্ব নেবেন না। এমনকি মৃত্যুর আগেই তারা জানিয়ে দিয়েছিলেন, নিথর দেহটাও তারা গ্রহণ করবেন না।
গত ৩০ এপ্রিল রাতে যখন খোকন মিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখনও একটি আশা ছিল—হয়তো রক্তের টান শেষ মুহূর্তে জয়ী হবে। সেই আশায় পাঁচ দিন মরদেহ রাখা হয়েছিল হাসপাতালের হিমঘরে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা থেকে শুরু করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় যোগাযোগ করেছেন পরিবারের সঙ্গে। এমনকি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বাতিঘর’ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ও দাফনের যাবতীয় খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছোট ছেলে রানাকে অনুরোধ করা হয়েছিল। রানা প্রথমে আসার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত আর আসেননি। উল্টো ফোনে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘বাবার মরদেহ দাফন করে ফেলতে, আর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।’
১০-১২ বছর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকাটাই কি সব সম্পর্কের ইতি? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের মুখে। আইনি সব প্রক্রিয়া শেষে গত মঙ্গলবার দুপুরে এক বুক হাহাকার আর শূন্যতা নিয়ে খোকন মিয়াকে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবেই দাফন করা হয়। বাতিঘরের চেয়ারম্যান আজহার উদ্দিনের কণ্ঠে ছিল চরম আক্ষেপ, তিনি বললেন, "আমরা চেয়েছিলাম অন্তত শেষ বিদায়টা যেন তার আপনজনদের হাত ধরে হয়। কিন্তু মায়া আর মমতা হার মেনেছে জেদের কাছে।"
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলেও মানবিকতার খাতিরে তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু যে সন্তানরা জীবিত বাবার খোঁজ নেয়নি, তারা মৃত বাবার পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনও বোধ করেনি। এভাবে এক বাবার জীবনকাহিনি শেষ হলো হাসপাতালের হিমঘর থেকে অচেনা এক গোরস্থানের নিঝুম অন্ধকারে, যেখানে আপনজনদের কান্নার বদলে ছিল একরাশ নীরবতা।