​এপ্রিলেও থামেনি রক্তক্ষরণ: সাংবাদিক নিগৃহীত, মব জাস্টিসের ভয়ংকর থাবা

 প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

​এপ্রিলেও থামেনি রক্তক্ষরণ: সাংবাদিক নিগৃহীত, মব জাস্টিসের ভয়ংকর থাবা

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে এপ্রিল মাস বিদায় নিলেও রেখে গেছে এক রক্তাক্ত ও উদ্বেগজনক ছবি। গত এক মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি যে কতটা নাজুক ছিল, তা উঠে এসেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেন এক অস্থির সময় পার করেছে বাংলাদেশ।

​সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা। এপ্রিল মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ৭৫ জন সাংবাদিককে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। কেউ আহত হয়েছেন রাজপথে, কাউকে দেওয়া হয়েছে প্রাণনাশের হুমকি, আবার কাউকে পড়তে হয়েছে মামলার জালে। ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যম ও এইচআরএসএসের মাঠ পর্যায়ের তথ্যে দেখা যায়, মোট ৪০টি ঘটনায় এই সাংবাদিকরা লাঞ্ছিত হয়েছেন। যখন তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি, তখন সাংবাদিকদের ওপর এমন ধারাবাহিক আক্রমণ সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত।

​অন্যদিকে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির সংস্কৃতি। চোর-ডাকাত কিংবা ধর্ম অবমাননার সন্দেহে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতায় গত মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ২২ জন মানুষ। ৪৪টি পৃথক ঘটনায় এই মর্মান্তিক মৃত্যুগুলো ঘটেছে, যা প্রমাণ করে জননিরাপত্তা আজ কতটা ভঙ্গুর। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতাও থামেনি। যদিও মার্চের তুলনায় এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক সংঘাতের সংখ্যা কিছুটা কম, তবুও ৯৮টি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। বিচিত্র বিষয় হলো, এই সহিংসতার বড় একটি অংশই ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি কিংবা আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।

​শুধু রাজপথ নয়, অস্থিতিশীলতা ডালপালা মেলেছে ঘরোয়া ও কর্মক্ষেত্রেও। এপ্রিল মাসটি নারী ও শিশুদের জন্য ছিল এক আতঙ্কের নাম। প্রায় ৩০০ নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির মতো জঘন্য ঘটনা ছিল শিউরে ওঠার মতো। পারিবারিক কলহের জেরে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৪ জন নারী। এমনকি দিনমজুর বা শ্রমিক শ্রেণিকেও ছাড় দেয়নি এই অস্থিরতা। অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৪ জন শ্রমিক।

​সব মিলিয়ে দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর জননিরাপত্তার অভাব বাংলাদেশকে এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ওপর যেভাবে আঘাত আসছে, তা রোধ করা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে প্রশাসনের দিকে—কবে ফিরবে জীবনের নিরাপত্তা আর কবে থামবে এই অহেতুক রক্তপাত।

Advertisement
Advertisement
Advertisement