পতনোন্মুখ কি পেট্রোডলারের রাজত্ব? বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে নতুন মেরুকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বিশ্ব অর্থনীতির অলিখিত নিয়মটি কয়েক দশক ধরে ছিল খুবই সহজ—মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল যাবে পশ্চিমে, আর তার বিনিময়ে সবুজ রঙের মার্কিন ডলার ফিরে আসবে আরব ভূমিতে। সত্তর দশকে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে গড়ে ওঠা এই ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা ডলারকে বানিয়েছিল বিশ্বের অবিসংবাদিত রাজা। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের দামামা সেই সাজানো মঞ্চের ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে। কয়েক দশকের স্থিতিশীলতা ভেঙে এখন এক নতুন আর্থিক সংঘাতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
গল্পের শুরুটা হয় ১৯৭৪ সালের এক গোপন সমঝোতার মাধ্যমে। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম সায়মন সৌদি আরবের সঙ্গে এমন এক ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেন, যেখানে তেলের দাম নির্ধারিত হবে কেবল ডলারে। বিনিময়ে সৌদি আরব সেই উদ্বৃত্ত ডলার দিয়ে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিনবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে যোগাবে অফুরন্ত প্রাণশক্তি। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে সেই বন্ধন শিথিল হতে শুরু করেছে। গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, হরমুজ প্রণালি এখন কেবল তেলের নয়, বরং ডলারের এক কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক অস্থিরতায় ইরান যখন হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে, তখন দেখা যাচ্ছে এক বিচিত্র চিত্র। যে ট্যাংকারগুলো চীনের মুদ্রা ইউয়ানে মাশুল দিচ্ছে, তারা অনায়াসেই পার পেয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে এশিয়ার শোধনাগারগুলো এখন আর ডলারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকছে না। ডিজিটাল মুদ্রা ও ক্রিপ্টোকারেন্সির অনুপ্রবেশ এই বিচ্ছেদকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বাজার বিশ্লেষক আবিশুর প্রকাশের মতে, এটি আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলার-নির্ভরতা কমানোর প্রক্রিয়া এখন রূঢ় বাস্তব।
সবচেয়ে বড় চমক হয়ে এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক (OPEC) ত্যাগের ঘোষণা। তেলের উৎপাদন ও দাম নির্ধারণে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখার এই সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর একমুখী ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে চায় না। ব্রিকস (BRICS) জোটের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এই আগুনেই যেন ঘি ঢেলেছে। এই জোটের সদস্য হওয়া এখন তেলের বাজারে এক বিশেষ ‘ভিআইপি পাস’ পাওয়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়িয়ে বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য করার সুবিধা মিলছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। পেট্রোডলার ব্যবস্থা কি কালকেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন—না। ডলারের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও বিশ্বজুড়ে এর গ্রহণযোগ্যতা এখনো পাহাড়ের মতো অটল। যখনই কোনো যুদ্ধ বা বড় সংকট তৈরি হয়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মানুষ এখনো ডলারের দিকেই ছোটে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা এখনো তুঙ্গে। ফলে ব্যবস্থাটি পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও এটি এখন আর আগের মতো ‘নিশ্ছিদ্র’ নয়।
[Image showing a comparison of global reserve currencies with the US Dollar leading]
আমরা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। তেলের বাজারে এখন সমান্তরাল দুটি ধারা তৈরি হয়েছে—একদিকে প্রথাগত ডলারভিত্তিক ব্যবস্থা, অন্যদিকে ইউয়ান-রুপি ও ডিজিটাল মুদ্রার এক বিদ্রোহী বলয়। পেট্রোডলারের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য হয়তো বিলীন হচ্ছে না এখনই, কিন্তু যে ফাটল ধরেছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেওয়ার সংকেত দিচ্ছে। এককালের অজেয় সেই কাঠামো এখন যেন এক অস্থির ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।