দিদিমণির ‘দুর্গ’ চুরমার: ঘাসফুল ঝরিয়ে কেন পদ্ম ফোটাল পশ্চিমবঙ্গ?
নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ ১৫ বছরের একাধিপত্যের অবসান। গঙ্গার পাড়ে পরিবর্তনের ঢেউ এবার আর কোনো স্লোগান নয়, বরং বাস্তব। বামদের দীর্ঘকালীন ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে বিজেপির এই ‘ভূমিধস’ জয় কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লড়াকু নেত্রীর কেন এই শোচনীয় পরাজয়? আর কেই-বা হচ্ছেন ওপার বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী?
তৃণমূলের পতন: যেখানে ভুল করেছিলেন মমতা
বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই হারের পেছনে রয়েছে একাধিক কৌশলগত ভুল। দীর্ঘ সময় দলটিকে পরামর্শ দিয়ে আসা ‘আই-প্যাক’ নামক সংস্থাটির ওপর অতি-নির্ভরতা এবার কাল হয়েছে মমতার জন্য। সংস্থাটির সাবেক প্রধান প্রশান্ত কিশোর বর্তমানে বিহারের রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকায় আই-প্যাক সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের মাটির জটিল সমীকরণ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মুসলিম ভোটব্যাংকের ওপর তৃণমূলের অতিরিক্ত ভরসা এবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। অতীতে মুসলিম ভোটের প্রায় ৮০ শতাংশ মমতার ঝুলিতে গেলেও, এবার ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির মতো নতুন শক্তিগুলো সেই ভোটে ভাগ বসিয়েছে। অন্যদিকে, হিন্দু ভোটের প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ নিজেদের পক্ষে টেনে নিয়ে বিজেপি এক অভাবনীয় মেরুকরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ মানুষের ভাষায়, পশ্চিমবঙ্গ যখন কাউকে দেয়, তখন উজাড় করেই দেয়—এবার সেই দান ছিল বিজেপির পক্ষে।
বিজেপির ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ও জয়ের নেপথ্য কাহিনী
বিজেপির এই জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত ৩-৪ বছর ধরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সাজিয়েছিল গেরুয়া শিবির। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলের ভিত্তি নড়বড়ে করে দিয়েছে তারা।
সবচেয়ে বড় চমক ছিল বিজেপির ‘ভাতা কার্ড’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সামাজিক ভাতা দিতেন, বিজেপি তা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। গ্রামীণ অঞ্চলের একটি পরিবার যেখানে আগে ৬ হাজার টাকা পেত, সেখানে ১২ হাজার টাকা পাওয়ার আশায় মানুষ দু’হাত তুলে বিজেপিকে সমর্থন করেছে। এছাড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ২৭ লাখ ‘ভুয়া’ ও ‘বহিরাগত’ ভোটার বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও বিজেপির জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শঙ্কা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
বিজেপির জয় যেমন উদ্দীপনা তৈরি করেছে, তেমনি কিছু গভীর প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। উত্তর ভারতের কৃষ্টিতে বড় হওয়া একটি দল কীভাবে বাঙালির চিরায়ত মনন ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাবে? ৩০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার এই রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের বিজেপি কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবে? এছাড়া দীর্ঘ কয়েক দশকের বাম ও তৃণমূলী রাজনীতির শেকড় উপড়ে বিজেপি কতটা গভীরে পৌঁছাতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।
বাংলাদেশের জন্যও এই ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২ হাজার কিলোমিটার সীমান্তবেষ্টিত এই রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায়ন দুই দেশের সম্পর্ক, অনুপ্রবেশ সমস্যা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন কোনো মোড় আনে কি না, সেদিকে সতর্ক নজর রাখছে ঢাকা।
মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে কে?
এখন সবার মনে একটাই প্রশ্ন—নবান্নের পরবর্তী অধিপতি কে? আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন মমতার এক সময়ের সেনাপতি ও বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারী। ভবানীপুরে মমতাকে পরাজিত করতে পারলে তার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে দৌড়ে পিছিয়ে নেই রাজ্য বিজেপির বর্তমান সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার কিংবা বুদ্ধিজীবী মুখ স্বপন দাশগুপ্ত। আবার চমক হিসেবে কোনো কম পরিচিত মুখকেও বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে আসতে পারে—যা দলটির পুরোনো কৌশল।
পশ্চিমবঙ্গের আকাশ এখন গেরুয়া আবিরে রাঙা। এই পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।