কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছেই শিখতে চেয়েছিলেন খুনের কৌশল: হিশামের ‘চ্যাট হিস্ট্রি’ যেভাবে কাল হলো

 প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০৫:৩৭ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছেই শিখতে চেয়েছিলেন খুনের কৌশল: হিশামের ‘চ্যাট হিস্ট্রি’ যেভাবে কাল হলো

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ৫ মে, ২০২৬

​যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি দম্পতি হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে শুরু করেছে। এই নৃশংস খুনের তদন্তে এখন সবচেয়ে বড় ‘ডিজিটাল সাক্ষী’ হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি। প্রসিকিউটরদের দাবি, অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়েহ হত্যাকাণ্ডের নীল নকশা সাজাতে এবং প্রমাণ লোপাটের উপায় খুঁজতে নিয়মিত চ্যাটজিপিটির শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

ডিজিটাল পায়ের ছাপ এবং একটি নৃশংস পরিকল্পনা

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার আগে থেকেই হিশামের আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। গত ১৩ এপ্রিল তিনি প্রথমবার চ্যাটজিপিটির কাছে অপরাধ সংক্রান্ত স্পর্শকাতর কিছু প্রশ্ন করেন। তদন্তে দেখা যায়, হিশাম জানতে চেয়েছিলেন কীভাবে একটি ঘর থেকে রক্তের দাগ পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় এবং মানুষের মৃতদেহ গুম করার সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ উপায়গুলো কী কী।

​পরবর্তীতে ১৬ এপ্রিল যখন লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হন, তার ঠিক পর পর হিশামের সার্চ হিস্ট্রিতে আরও ভয়াবহ সব প্রশ্ন উঠে আসে। তিনি চ্যাটবটটির কাছে জানতে চেয়েছিলেন, নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে ডিএনএ ধ্বংস করা সম্ভব কি না এবং আবর্জনার ট্রাকে কোনো কিছু ফেললে তা খুঁজে পাওয়া কতটা কঠিন।

​তদন্তে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই ডাস্টবিন

নিখোঁজ হওয়ার দশ দিন পর, ২৩ এপ্রিল হিলসবরোর একটি ডাস্টবিনে পুলিশ কিছু রক্তমাখা কালো কুশন, ফ্লোর ম্যাট এবং একটি মানিব্যাগ খুঁজে পায়। সেখানেই পাওয়া যায় লিমনের চশমা ও রক্তমাখা পোশাক। এই সূত্র ধরেই পরদিন হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় কালো প্লাস্টিকে মোড়ানো মানবদেহের খণ্ডিতাংশ, যা পরে ফরেনসিক পরীক্ষায় লিমনের বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

​পুলিশ যখন হিশামকে অন্য একটি ঘটনায় গ্রেফতার করে, তখন তার ফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। ফরেনসিক বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে যে, তিনি কেবল চ্যাটজিপিটিই নয়, বরং গুগলেও ‘ডেড বডি ডিকম্পজিশন’ বা মৃতদেহ পচন ধরার সময়সীমা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন।

​প্রসিকিউশনের শক্ত হাতিয়ার

আদালতে দাখিল করা হলফনামায় তদন্তকারীরা উল্লেখ করেছেন, হিশাম ভেবেছিলেন ডিজিটাল মাধ্যমে এসব তথ্য খুঁজলে তা গোপন থাকবে। কিন্তু তার প্রতিটি ‘সার্চ কোয়েরি’ বা প্রশ্ন এখন তার বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার (Premeditated Murder) সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে তার এই কথোপকথন প্রমাণ করে যে, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় করা একটি অপরাধ।

​বর্তমানে ফ্লোরিডার কারাগারে আটক থাকা হিশামের বিরুদ্ধে জোড়া খুনের মামলাটি এখন চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায়। প্রযুক্তির সহায়তায় পার পাওয়ার চেষ্টা করলেও, সেই প্রযুক্তির রেখে যাওয়া সূত্রই এখন হিশামের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো লিমন ও বৃষ্টির এমন করুণ পরিণতিতে ফ্লোরিডায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে এখনও শোক ও আতঙ্কের ছায়া বিরাজ করছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement