নোবিটেক্সের ডিজিটাল সেতু: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিঁড়ে ইরানের নতুন অর্থনীতি
নিজস্ব প্রতিবেদক | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০১৮ সালে তেহরানের দুই ব্যবসায়ি ভাই আলি ও মোহাম্মদ খাররাজি—যারা বাস্তবে বিখ্যাত আদর্শগত পরিবার ‘খাররাজি’ গোষ্ঠীর তৃতীয় প্রজন্ম—তাদের বাস্তব পরিচয় ঢাকা রেখে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ‘নোবিটেক্স’ চালু করেন। এই প্ল্যাটফর্মটি আজ শুধু ইরানের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ নয়, বরং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পশ্চিমা অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যেও দেশের অর্থনীতিকে সামলে রাখার একটি অদৃশ্য ডিজিটাল সেতুতে পরিণত হয়েছে।
নোবিটেক্স বর্তমানে ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন পরিচালনা করে, যার মধ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের অর্থায়ন জড়িত বলে ব্লকচেইন ডেটা ও গণমাধ্যম রিপোর্টে বলা হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত দশকের পর দশক ধরে দশ থেকে শতাধিক মিলিয়ন ডলারের লেনদেন পরিচালনা করেছে, যার একাধিক অংশ সাংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান—ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও শক্তিশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি)—এর সাথে সংযুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধঘন মুহূর্তে যখন ইরানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ঘটে, তখনও নোবিটেক্সের সার্ভার এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যায়নি। ব্লকচেইন রেকর্ড অনুযায়ী, এই সংকটকালে একাধিক প্রতিবেদনে প্রায় ১০ কোটি ডলারেরও বেশি লেনদেন নোবিটেক্সের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, যা ইরানি সঞ্চয়কারী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তরল ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলার বা সুইফট নেটওয়ার্কে লেনদেন বন্ধ হওয়ার পরও ইরানের কিছু আর্থিক স্রোত বহাল রাখা সম্ভব হয়েছে।
নোবিটেক্সের ব্যবহারকারী সংখ্যা আজ ১১ মিলিয়নেরও বেশি, যা ইরানের মোট জনসংখ্যার কমনা বার্ষ শতাংশের বেশি। দেশের সাধারণ নাগরিক যখন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন অনেকের কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি একটি আপেক্ষিক স্থিতিশীল সঞ্চয় স্থাপনের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এই ভূমিকা নোবিটেক্সকে শুধু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান না রেখে “জাতীয় সংকটের সময়ের আর্থিক প্রতিরোধশক্তির প্রতীক” বানিয়ে দিয়েছে।
যাদের বংশধারা ইসলামী বিপ্লবের প্রারম্ভকাল থেকেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামো রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, সেই খাররাজি পরিবারের তারুণ্য এখন প্রযুক্তি ও আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় লিখছে। তাদের বাবা আয়াতুল্লাহ বাকের খাররাজি আইআরজিসির প্রাথমিক ভিত্তি গড়তে অবদান রেখেছিলেন; আজ তার দুই পুত্র নোবিটেক্সের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যকেই ডিজিটাল যুগে পুনর্ব্যাখ্যা করছেন। যদিও তারা কোম্পানির রেজিস্ট্রেশনে বিকল্প পদবি ব্যবহার করে নিজেদের রক্ত–সম্পর্ক আড়াল করেন, তবে তাদের প্রভাব ইরানের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর শীর্ষ স্তরে অনুভূত হচ্ছে।
ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের কাছে এই ব্যবস্থা “নিষেধাজ্ঞা বাইপাসের কালো পথ” হিসেবে দৃশ্যমান, কিন্তু ইরানের জন্য এটি নিজস্ব অর্থনীতিতে সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ রাখার একটি টেকনোলজিক্যাল সাফল্য। মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনের মতো নীতি প্রণেতারা নোবিটেক্সকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখলেও, তেহরানের নীতি প্রণয়নকারীরা এটিকে যুদ্ধ–উপসর্গ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে টিকে থাকার একটি অজেয় অস্ত্র হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।
এদিকে পশ্চিমা শক্তিগুলো আইআরজিসির ফান্ডিং ও বিদেশি লেনদেন বন্ধ করার লক্ষ্যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা চালু রাখলেও নোবিটেক্সের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সেই লক্ষ্যে বাধা সৃষ্টি করেছে। ইরান আজ শুধু ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক নয়, ব্লকচেইন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ভিত্তিক সমান্তরাল ব্যবস্থার সাহায্যেও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির কিছু অংশে সংযুক্ত থাকতে চাইছে। এই প্রেক্ষাপটে নোবিটেক্স শুধু একটি এক্সচেঞ্জ নয়, বরং ইরান–মার্কিন ক্ষমতার নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের একটি লুকানো অঙ্গনে পরিণত হয়েছে।