রূপালি পর্দা থেকে রাজসিংহাসনে: তামিলনাড়ুতে বিজয়-বিপ্লব

 প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

রূপালি পর্দা থেকে রাজসিংহাসনে: তামিলনাড়ুতে বিজয়-বিপ্লব

​নিজস্ব প্রতিবেদক 

তামিলনাড়ুর রাজনীতির দীর্ঘ কয়েক দশকের অচলায়তন ভেঙে ইতিহাস গড়লেন থালাপতি বিজয়। পর্দার মারকুটে নায়ক থেকে বাস্তবের জননেতা হয়ে ওঠার যে স্বপ্ন তিনি বুনেছিলেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তার সফল প্রতিফলন দেখল দক্ষিণ ভারত। থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন দল ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার খুব কাছে পৌঁছে গিয়ে রাজ্যের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

​দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান

​১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) চলচ্চিত্র জগৎ থেকে এসে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে চমকে দিয়েছিলেন পুরো বিশ্বকে। দীর্ঘ ৪৯ বছর পর সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছেন জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, ভক্তদের কাছে যিনি ‘থালাপতি’ নামেই পরিচিত। যদিও এর আগে জয়ললিতার মতো তারকারা শাসন করেছেন, তবে তিনি ছিলেন এমজিআরের উত্তরসূরি। বিজয় সেখানে সম্পূর্ণ নতুন একটি দল গড়ে শূন্য থেকে শিখরে আরোহণ করেছেন।

​নির্বাচনী ফলাফল ও সমীকরণ

​তামিলনাড়ু বিধানসভার ২৩৪টি আসনের মধ্যে বিজয়ের দল টিভিকে ইতিমধ্যে ৯৬টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে এবং আরও ১১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার ১১৮ ছুঁতে না পারলেও, একক বৃহত্তম দল হিসেবে সরকার গঠনের চাবিকাঠি এখন বিজয়ের হাতেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

​ফ্যান ক্লাব থেকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর

​বিজয়ের এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ২০০৯ সাল থেকেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তিনি এগোচ্ছিলেন। তাঁর অসংখ্য ফ্যান ক্লাবকে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ সংগঠনের আওতায় এনে তৃণমূল পর্যায়ে জনসেবামূলক কাজ শুরু করেন। ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ার পরই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর জনপ্রিয়তা কেবল করতালিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ব্যালট বক্সেও রূপান্তরযোগ্য।

​২০২৪ সালে টিভিকে গঠনের পর বিজয় ঘোষণা করেছিলেন, তিনি আর সিনেমা করবেন না। প্রায় ৭০টি সিনেমায় দাপুটে অভিনয়ের পর ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় অভিনয় ছেড়ে দেওয়াটা ভোটারদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছিল যে—বিজয় রাজনীতিতে এসেছেন কেবল মানুষের সেবা করতে, কোনো ‘পার্ট টাইম’ শখ পূরণ করতে নয়।

​তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর

​নির্বাচনী প্রচারণায় বিজয় নিজেকে গতানুগতিক নেতার বাইরে একজন ‘শ্রোতা’ হিসেবে তুলে ধরেন। বেকারত্ব, দুর্নীতি, শিক্ষা এবং কেন্দ্রের দমননীতির বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো অবস্থান বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনায় তাঁর ধারালো বক্তব্য অনলাইন দুনিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে একটি দলীয় সভায় অনাকাঙ্ক্ষিত পদদলিত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিমিত ও দায়িত্বশীল আচরণ সাধারণ মানুষের মনে ভরসার জায়গা তৈরি করে।

​এক নতুন ভোরের অপেক্ষা

​চেন্নাইয়ের রাস্তায় এখন কেবলই উৎসবের আমেজ। ৪ মে সকালে বিজয় যখন তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন হাজার হাজার ভক্তের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। তামিলনাড়ুর মানুষ এখন ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র চিরাচরিত বৃত্তের বাইরে এক পরিচ্ছন্ন বিকল্পের স্বপ্ন দেখছে।

​সবকিছু ঠিক থাকলে খুব শীঘ্রই তামিলনাড়ুর সচিবালয়ে বসতে যাচ্ছেন এই নতুন নায়ক। রূপালি পর্দার বীরত্ব এখন বাস্তব প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপান্তরিত হয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো ভারত।

Advertisement
Advertisement
Advertisement