থাইল্যান্ডের আকাশে জুলাইয়ের ক্ষত: ব্যাংককে যোদ্ধাদের শিয়রে ডা. শফিকুর রহমান
ডেস্ক নিউজ
ব্যাংককের ভেজথানি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের করিডোরগুলোতে আজ এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিদেশের মাটিতে যন্ত্রণার সাথে লড়াই করা 'জুলাই বিপ্লবের' বীর যোদ্ধাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার (৯ মে) স্থানীয় সময় সকালে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন আহত বিপ্লবীদের দেখতে যান।
রাজধানীর কোলাহল থেকে দূরে, থাইল্যান্ডের এই উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে এখন ঠাঁই হয়েছে বাংলাদেশের সেই সব সন্তানদের, যারা একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় নিজেদের রক্ত ও অঙ্গ বিসর্জন দিয়েছেন। তাদের কারো চোখে ব্যান্ডেজ, কারো শরীরে বুলেটের গভীর ক্ষত, আবার কেউ হারিয়েছেন চিরতরে হাঁটার ক্ষমতা। কিন্তু ডা. শফিকুর রহমান যখন তাদের শিয়রে গিয়ে বসলেন, তখন কষ্টের রেখা ছাপিয়ে ফুটে উঠল প্রাপ্তির হাসি।
যোদ্ধাদের খোঁজ ও হৃদয়ের বন্ধন
সকাল থেকেই ডা. শফিকুর রহমান হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন গুরুতর আহত যোদ্ধাদের সাথে সময় কাটান। তিনি প্রতিটি শয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ান, পরম মমতায় আহতদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন এবং তাদের স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে চিকিৎসকদের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন।
এ সময় আমিরে জামায়াত বলেন,
"আপনারা এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। আপনাদের এই ত্যাগ বৃথা যাবে না। বাংলার জমিন আপনাদের বীরত্বের কথা চিরকাল স্মরণ রাখবে। আমরা আপনাদের কেবল সমবেদনা জানাতে আসিনি, আমরা এসেছি আপনাদের ঋণের কিছুটা স্বীকার করতে।"
তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এই যোদ্ধাদের চিকিৎসায় যেন বিন্দুমাত্র কমতি না থাকে। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞ সেবা নিশ্চিত করার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
আর্তনাদ ও আকাঙ্ক্ষা: 'জুলাই সনদ' ও 'গণভোট'
হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা আহত যোদ্ধারা যখন আমিরে জামায়াতকে কাছে পান, তখন তাদের কণ্ঠে ঝরে পড়ে দেশপ্রেমের আকুতি। শারীরিক যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে তারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও জুলাই বিপ্লবের চেতনা নিয়ে কথা বলেন। অনেক যোদ্ধা আবেগাপ্লুত হয়ে ডা. শফিকুর রহমানকে অনুরোধ করেন যেন 'জুলাই সনদ' ও 'গণভোটের রায়' বাস্তবায়নে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে কার্যকর ও কঠোর ভূমিকা পালন করেন।
যোদ্ধারা স্মরণ করিয়ে দেন যে, তারা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য রাজপথে রক্ত দেননি, বরং একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করেছেন। জামায়াত আমির তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, শহীদের রক্ত আর গাজীদের ত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দেশপ্রেমিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
সাথে ছিলেন ব্যারিস্টার আরমান
ডা. শফিকুর রহমানের এই বিশেষ সফরে তার সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। তিনি আহতদের আইনি ও কৌশলগত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন এবং বিদেশে তাদের অবস্থানের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে তদারকি করেন।
সফরের শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত করেন। হাসপাতালের নিরবতা ভেঙে তখন কেবল শোনা যাচ্ছিল কান্নার সুর আর দ্রুত আরোগ্যের আকুতি। তিনি দোয়া করেন যেন এই তরুণ যোদ্ধারা দ্রুত সুস্থ হয়ে দেশের মাটিতে ফিরে আবার জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন।
পরিশেষে,
বিদেশি হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর যন্ত্রপাতির যান্ত্রিকতার মাঝে ডা. শফিকুর রহমানের এই সফর যেন এক টুকরো বাংলাদেশ হয়ে ধরা দিয়েছিল আহতদের কাছে। এটি কেবল রাজনৈতিক সৌজন্য ছিল না, বরং ছিল একজন অভিভাবকের তার সন্তানদের প্রতি গভীর মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। যা জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে আরও একবার শাণিত করে তুলল।