লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত মরুভূমি: মক্কায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি, স্বজন হারানো বেদনায় সিক্ত হজের পথ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
তপ্ত মরুভূমির বালুরাশিতে এখন লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনির প্রতিধ্বনি। মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পবিত্র হজের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ৫০ হাজারেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান। নিদাঘ সূর্যের প্রখরতা ছাপিয়ে তাঁদের হৃদয়ে এখন শুধুই পরম করুণাময়ের সান্নিধ্য পাওয়ার আকুলতা। তবে এই পবিত্র সফরের আনন্দ ও আধ্যাত্মিক আবহের মাঝে বিষাদের ছায়া হয়ে এসেছে ১২ জন হজযাত্রীর চিরবিদায়ের সংবাদ। প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা আর স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষা—দুইয়ে মিলে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে মক্কা ও মদিনার অলিগলিতে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ ব্যবস্থাপনা পোর্টালের তথ্যমতে, গত ৮ মে পর্যন্ত সর্বমোট ৫০ হাজার ৯৬ জন হজযাত্রী নিরাপদে সৌদি আরবে পা রেখেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গিয়েছেন ৪ হাজার ৭১ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪৬ হাজার ২৫ জন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সৌদি এয়ারলাইন্স এবং ফ্লাইনাস এয়ারলাইন্সের মোট ১২৮টি ফ্লাইটে করে তাঁরা এই পুণ্যভূমিতে পৌঁছান। আগামী ২৬ মে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও হজযাত্রীদের পদচারণায় এখনই মুখর কাবা চত্বর।
হজের এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞে সেবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সৌদি আরবে নিয়োজিত বাংলাদেশি আইটি হেল্পডেস্ক ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও হজযাত্রীরা যেন নিজ দেশের পরম মমতা পান, সে লক্ষ্যে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার হজযাত্রীকে স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হয়েছে, আর আইটি হেল্পডেস্ক থেকে ১৩ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা গ্রহণ করেছেন।
তবে এই পবিত্র সফরের মাঝপথে অনেক পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম। মক্কা ও মদিনার পবিত্র মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ১২ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী। তাঁদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ ও ২ জন নারী। সর্বশেষ মক্কায় চিরবিদায় নিয়েছেন যশোরের ৫৩ বছর বয়সী মো. আব্দুল মতিন। প্রিয় জন্মভূমি থেকে বহু দূরে জান্নাতুল মুয়াল্লা কিংবা জান্নাতুল বাকির পবিত্র মাটিতে তাঁদের সমাহিত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। প্রিয়জন হারানোর এই শূন্যতা কাটিয়ে অন্য হজযাত্রীরা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁদের মাগফিরাত কামনা করছেন।
আগামী ২১ মে সৌদি আরবে যাওয়ার শেষ ফ্লাইটটি ঢাকা ত্যাগ করবে। এরপর শুরু হবে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। আরাফাতের ময়দান থেকে মুজদালিফা—সবখানেই লাল-সবুজের পতাকাবাহী এই মানুষগুলো বাংলাদেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য মোনাজাত করবেন। হজের পবিত্র আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ৩০ মে থেকে শুরু হবে ফিরতি যাত্রা, যা চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। স্বজনদের অপেক্ষায় থাকা হাজারো চোখ যেমন ফিরে আসার প্রহর গুনছে, তেমনি যারা আর ফিরবেন না, তাঁদের জন্য রোনাজারি আর প্রার্থনায় ভারী হয়ে উঠছে মক্কার আকাশ।