বিশ্বমঞ্চে বাংলার কণ্ঠস্বর: অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় নতুন দিগন্তের ডাক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে তখন চাঁদের আলোর মতো উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা। বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মুখরিত ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন রিভিউ ফোরামের (আইএমআরএফ) সাধারণ বিতর্ক কক্ষ। সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে বাংলাদেশের হয়ে যখন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ডায়াসে দাঁড়ালেন, তখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো দক্ষিণ এশিয়ার এই উদীয়মান শক্তির দিকে। কোনো শুষ্ক কূটনৈতিক বক্তৃতা নয়, বরং কয়েক কোটি রেমিট্যান্স যোদ্ধার স্বপ্ন আর সংগ্রামের আর্তিকে তিনি তুলে ধরলেন বিশ্ববাসীর সামনে।
শুক্রবার এক আবেগঘন ও বলিষ্ঠ বক্তব্যে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী স্পষ্ট করে দিলেন যে, অভিবাসন কেবল একটি দেশের সীমান্ত পার হওয়ার গল্প নয়; এটি লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা এবং মর্যাদার প্রশ্ন। তিনি বিশ্ব নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, অভিবাসীদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। দালালের খপ্পরে পড়ে কোনো শ্রমিকের জীবন যাতে বিপন্ন না হয়, সেজন্য তিনি বৈশ্বিক জবাবদিহিতা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের এই উদ্যোগ কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়—মন্ত্রী অত্যন্ত গর্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, গত আইএমআরএফ-এ দেওয়া ১০টি অঙ্গীকারের মধ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৭টি বাস্তবায়ন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সেই সফলতার ধারাবাহিকতায় এবারও ছয়টি নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় যে আমূল পরিবর্তন আসছে, তার প্রমাণ হিসেবে মন্ত্রী তুলে ধরেন ‘মাইগ্রেশন কমপ্যাক্ট টাস্কফোর্স’ এবং ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের সুদূরপ্রসারী জাতীয় কর্মপরিকল্পনার কথা।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা আজ মানুষকে ঘরছাড়া করছে। এই ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ বা জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য উন্নত বিশ্বের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তার দাবি জানান, যা উপস্থিত প্রতিনিধিদের মাঝে গভীর চিন্তার রেখা টেনে দেয়।
বাংলাদেশ আজ কেবল শ্রমিক রপ্তানিকারক দেশ নয়, বরং নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের এক বৈশ্বিক রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়। ‘হোল-অফ-গভর্নমেন্ট অ্যান্ড হোল-অফ-সোসাইটি’—অর্থাৎ সরকারের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে এক স্বচ্ছ অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে প্রত্যয় বাংলাদেশ দেখিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে।
দিনের শেষে যখন মন্ত্রী সমন্বয় ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন, তখন তা কেবল একটি দেশের কণ্ঠস্বর হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের প্রান্তিক অভিবাসীর ন্যায়বিচার পাওয়ার এক সাহসী ইশতেহার। জাতিসংঘের এই ফোরামে বাংলাদেশের এই জোরালো অবস্থান দেশের প্রবাসী কর্মীদের জন্য এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।