ফ্লোরিডার আকাশ ভেঙে মাদারীপুরে শেষ বিদায়: ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে ফিরলেন সুলতানা বৃষ্টি

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

ফ্লোরিডার আকাশ ভেঙে মাদারীপুরে শেষ বিদায়: ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে ফিরলেন সুলতানা বৃষ্টি

ডেক্স নিউজ:

​আকাশের কান্না কি মাটির কান্নার সাথে মিশে যেতে পারে? আজ সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আকাশটা যখন মেঘলা হয়ে ছিল, তখন সেখানে এক বুক হাহাকার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক দম্পতি। তারা এসেছেন তাদের আদরের মেয়ে সুলতানা বৃষ্টিকে গ্রহণ করতে। তবে কোনো ট্রলি ভর্তি উপহার কিংবা বিদেশ বিভুঁইয়ের গল্প নিয়ে নয়, বৃষ্টি ফিরলেন কফিনে বন্দী হয়ে, নিথর দেহে। সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে পড়া এই মেধাবী শিক্ষার্থীর মরদেহ আজ শনিবার সকালে দুবাই হয়ে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করেছে।

​সকাল পৌনে ৯টার দিকে একটি সাদা হাইয়েস গাড়ি যখন বিমানবন্দরের ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিল, তখন ভেতরে থাকা স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। বৃষ্টির বাবা-মা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন রানওয়ের দিকে, যেখান থেকে একটু পরেই বেরিয়ে আসবে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার ধন। বৃষ্টির নানা আব্দুল আলী ধরা গলায় জানালেন, এই দৃশ্য দেখার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি জানান, মরদেহ বুঝে পাওয়ার পরপরই কোনো বিলম্ব না করে তারা রওনা দেবেন নাড়ির টানে, মাদারীপুরের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সেখানেই হবে জীবনের শেষ যাত্রা।

​সুলতানা বৃষ্টির এই বিদেশের যাত্রা ছিল স্বপ্নের পেছনে ছোটা। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় গবেষণারত এই তরুণীর চোখে ছিল দিগন্ত ছোঁয়ার স্বপ্ন। কিন্তু এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা সেই স্বপ্নের যবনিকা টেনে দেয়। তবে বৃষ্টি কেবল শূন্য হাতে ফেরেননি। তার মেধা ও ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক অনন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃষ্টি এবং একই দুর্ঘটনায় নিহত অপর শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। বসন্তকালীন সমাবর্তনের আনন্দ আয়োজনে তাদের নাম উচ্চারিত হবে পরম শ্রদ্ধায়। মিয়ামির বাংলাদেশ কনস্যুলেটের প্রতিনিধি তাদের পরিবারের পক্ষে এই সম্মাননা গ্রহণ করবেন। এটি যেন এক বিষাদময় প্রাপ্তি—যেখানে সাফল্যের মুকুট আছে, কিন্তু তা পরিয়ে দেওয়ার মতো মানুষটি আর নেই।

​এদিকে মাদারীপুরে বৃষ্টির গ্রামের বাড়িতে এখন কেবলই শোকের মাতম। যে উঠোনে শৈশবে বৃষ্টি খেলা করতেন, সেখানে আজ তার জানাজার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাদ আসর স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে তার প্রিয় দাদা-দাদির কবরের পাশে। পারিবারিক কবরস্থানের সেই শান্ত ছায়াতলে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন এই মেধাবী গবেষক। এর আগে একই ঘটনায় প্রাণ হারানো জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ গত ৪ মে দেশে পৌঁছালে তাকেও অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানায় তার পরিবার।

​ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যখন বৃষ্টির মরদেহবাহী কফিনটি বিমানে তোলা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের প্রতিনিধিরা এক গভীর মৌনতায় তাকে বিদায় জানিয়েছিলেন। আজ মাদারীপুরের মাটিতে যখন তাকে সমাহিত করা হবে, তখন হয়তো ডক্টরেট ডিগ্রির সেই সনদটি হবে তার মেধার এক অবিনশ্বর সাক্ষী। এক বুক আশা নিয়ে দেশ ছাড়া মেয়েটি আজ ফিরলেন ঠিকই, কিন্তু সেই ফেরা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়ে গেল। মাদারীপুরের শান্ত জনপদ আজ এক মেধাবীকে হারানোর বেদনায় মুহ্যমান।

Advertisement
Advertisement
Advertisement