মাতুয়াইলে আগুনের লেলিহান শিখা: নিঃস্ব এক ফোম কারখানা, বীরত্ব ও ধ্বংসের আখ্যান

 প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১১:২৬ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

মাতুয়াইলে আগুনের লেলিহান শিখা: নিঃস্ব এক ফোম কারখানা, বীরত্ব ও ধ্বংসের আখ্যান

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​শুক্রবার বিকেলের ম্লান আলো যখন সন্ধ্যার অন্ধকারে বিলীন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই রাজধানীর মাতুয়াইলের আকাশ ছেয়ে যায় কুচকুচে কালো ধোঁয়ায়। সাদ্দাম মার্কেট এলাকায় অবস্থিত ‘এইচ এন ফোম ফ্যাক্টরি’তে লাগা আগুনের লেলিহান শিখা মুহূর্তেই রূপ নেয় এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে। পরিত্যক্ত ফোম থেকে ম্যাট্রেস তৈরির এই কারখানায় যখন আগুনের সূত্রপাত হয়, তখন আশেপাশে থাকা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। দাহ্য পদার্থের মজুত থাকায় আগুনের জিহ্বা যেন দানবীয় শক্তিতে গ্রাস করতে থাকে কারখানার দুটি ভবনকে।

​ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রথম খবরটি পৌঁছায়। সময় নষ্ট না করে একে একে সাতটি ইউনিট ছুটে যায় ঘটনাস্থলে। পৌনে ৭টার দিকে যখন প্রথম ইউনিটটি কাজ শুরু করে, ততক্ষণে আগুনের তীব্রতা চারপাশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ফোম আর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আগুনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, তা নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। তবে কারখানার ঠিক পাশেই থাকা একটি পুকুর যেন বিধাতার আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয় অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের কাছে। পানির সহজলভ্যতা এবং চারপাশের কাঠামোগত ব্যারিকেড না থাকলে হয়তো এই বিপর্যয় আশপাশের জনবহুল ভবনেও ছড়িয়ে পড়তে পারত।

​দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর যুদ্ধের পর, রাত ৯টা ৫ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় আগুনের দাপট স্তিমিত হয়। এই লড়াইয়ে জীবন বাজি রেখে কাজ করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের এক সাহসী কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন, যা আবারও মনে করিয়ে দেয় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই বাহিনীর ত্যাগের কথা।

​প্রাথমিক অনুসন্ধানে বৈদ্যুতিক লাইনের গোলযোগ বা শর্ট সার্কিটকে আগুনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এর পেছনে থাকা অবহেলা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, এমন ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় দাহ্য পদার্থের স্তূপ নিয়ে কারখানা পরিচালনা করা রীতিমতো আগ্নেয়গিরির ওপর বসবাস করার সমান। আইনের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা এই কারখানাটিতে অগ্নিনির্বাপণের ন্যূনতম ব্যবস্থা ছিল কি না, তা এখন বড় জিজ্ঞাসার বিষয়।

​আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ইতিমধ্যেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেলেও মাতুয়াইলের বাতাসে এখনো রয়ে গেছে পোড়া গন্ধ আর স্বজন হারানো হাহাকারের মতো এক বিষণ্ণ নিস্তব্ধতা। তদন্ত শেষে বেরিয়ে আসবে কারখানার বৈধতা আর গাফিলতির আসল রূপ, তবে সেই পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে রইল মালিকের স্বপ্ন আর এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে একরাশ আতঙ্ক।

Advertisement
Advertisement
Advertisement